মুহাম্মদ শব্দের অর্থই হল প্রশংসিত। মুসলিমদের মতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর বার্তাবাহক এবং অমুসলিমদের মতে তিনি ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রবর্তক। 570 সালে পবিত্র মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে এই মহামানব জন্মগ্রহণ করেন অধিকাংশ ইতিহাসত্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা কারণ তিনি আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেছিলেন। 1978 সালে সমকালীন ঐতিহাসিক ও গণিতবিদ মাইকেল হার্ট বিখ্যাত কয়েকজন ইতিহাসবিদ এবং জীবনীগ্রন্থ লেখকদের সহায়তায় একটি বই রচনা করেন। তাদের এই বই রচনার উদ্দেশ্য ছিল সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী 100 জন মনীষীর জীবনী সংকলন করা।
অর্থাৎ যাদের কর্মের দ্বারা এই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে। এই তালিকা তৈরি করতে তারা 32 টি বিশেষ ক্যাটাগরি বা যোগ্যতার উপর নির্ভর। মাইকেল হার্ট বলেছিলেন, "আমি একজন খ্রিস্টান হিসেবে এই তালিকায় সবার উপরে যীশু খ্রীষ্টকে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বেশ কয়েকটি যোগ্যতার অভাবের কারণে তাকে তালিকায় এক নম্বরে জায়গা দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ যীশুখ্রীষ্ট কোন রাষ্ট্রনায়ক শাসক বা যোদ্ধা ছিলেন না এমনকি যীশু খ্রীষ্টের কোন পরিবার বা স্ত্রী সন্তানও ছিল না। সেজন্য মাইকেল হার্ট সহ তার সহযোগী সকলে এক বাক্যে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয় পৃথিবীতে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমকক্ষ আর কেউ নেই। মাইকেল হার্ট আরো বলেন পৃথিবীর
সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম কে নির্বাচন করায় অনেকে অবাক হয়েছে। কিন্তু সর্বকালের ইতিহাসে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেছেন। বিখ্যাত লেখক জর্জ বার্নার্ড সহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মানবতার ত্রাণকর্তা আখ্যা দিয়ে বলেন তিনি যদি আধুনিক পৃথিবীর শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করতেন তাহলে তিনি অবশ্যই সকল সমস্যার সমাধান করতে সফল হতেন সেই সাথে আসতো পৃথিবীর জন্য অতি জরুরি সুখ শান্তি এছাড়াও আরো বহু অমুসলিম ইতিহাস বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শের ভূসী প্রশংসা করেছেন। [মিউজিক] বিগত প্রায়দেড় হাজার বছর ধরে শত শত
কোটি মুসলিম হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা চর্চা করে আসছে। অক্ষর জ্ঞানশূন্য একজন অনাথ শিশু যে কিনা মরুভূমির কঠোর পরিবেশে পিতা-মাতা ছাড়া বড় হয়েছেন তিনি তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বরবর এবং অনগ্রসর সমাজকে চরম উন্নত এক সভ্যতায় পরিণত করেছিলেন। তিনি একমাত্র দার্শনিক, যে কিনা তার জীবদ্দশায় নিজের দর্শনকে সমাজে শতভাগ প্রতিষ্ঠিত করতে সফল হয়েছিলেন। তিনি সারাজীবন ক্ষমা ও ঔর্যের সাধনা করেছেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় জন্মগ্রহণ করে সেখানেই বড় হন এবং তার সততার কারণে তৎকালীন সমাজের লোকেরা তাকে বিশ্বাসী উপাধি দেয়। কিন্তু তিনি যখন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত শান্তির বাণী প্রচার করতে শুরু করেন, তখন মক্কাবাসী ও
তার নিজের আত্মীয়দের দ্বারা চরম নির্যাতিত হন। এরপর তাকে অন্যায়ভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচতে তিনি স্থায়ীভাবে মদিনায় বসবাস করতে শুরু করেন। তার 23 বছর পর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। সে সময় তিনি ইতিহাসের অন্যান্য বিজয়ী শাসকদের মতো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি বরং যারা তাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল নির্মম অত্যাচার করেছিল তার অনুসারীদেরকে বিনা কারণে হত্যা করেছিল সেই বর্বর লোকদের উদ্দেশ্যে তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন তিনি যা শিক্ষা দিতেন তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তা নিজে বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে গিয়েছেন। তার মোহনীয় ব্যক্তিত্বের স্পর্শে সমগ্র আরব উপদ্বীপে শান্তি সাম্য ও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন
একটি দেশ এবং একটি সরকারের আকারে। তিনি একজন অনাথ বালক থেকে বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু তারপরও তার জীবনে বিন্দুমাত্র কোন পরিবর্তন আসেনি। বিশাল রাজত্ব লাভের পরেও তিনি ঠিক আগে যেমন খাবার খেতেন, যেমন পোশাক পড়তেন, ঠিক তেমনি চালিয়ে গেছেন। তিনি কোন প্রাসাদ নির্মাণ করেননি। অতি সাধারণ মাদুর বিছিয়ে মাটিতে ঘুমিয়েছেন। এমনকি এত বড় একজন শাসক তার জামা ছিড়ে গেলে নতুন জামা না কিনে নিজেই ছেড়া জামা সেলাই করে নিতেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত ন্যায়পরায়ণ এবং ন্যাজ্য শাসক। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোন বিজয়ী শাসকের মতো তিনি তার রাজত্ব তার বংশধরদের কাছে হস্তান্তর করেননি| তিনি বিচার করার সময় তার বন্ধু
এবং আত্মীয়স্বজনদের প্রাধান্য দিতেন না| সকলের জন্য তার আইন ছিল সমান| হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো মৃত্যুর পরের জীবনকে কেন্দ্র করে একমাত্র সৃষ্টি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর উপাসনা করা ছিল তার প্রধান বার্তা। সেই সাথে পৃথিবীর সকল ধরনের অন্যায় অত্যাচার সমূলে ধ্বংস করা ছিল তার লক্ষ্য। তিনি মানবজাতির এমন একজন শিক্ষক ছিলেন যিনি সবসময় উত্তম চরিত্র গঠনের শিক্ষা দিয়ে গেছেন এবং নিজের জীবনকে সর্বোত্তম চরিত্রের আদর্শ হিসেবে রেখে গেছেন। রাজত্ব অর্জন করতে বা ধরে রাখতে তিনি কোন কূট চক্রান্তের আশ্রয় নেননি। আর এখানেই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য সকল শাসক থেকে আলাদা। তিনি জীবনে কোনদিন তার স্ত্রী
চাকর বন্ধু এমনকি শত্রুর গায়েও হাত তোলেননি। শুধুমাত্র সেই শত্রুদেরকেই তিনি মোকাবেলা করেছেন যারা আল্লাহর হুকুম এবং তার বার্তার প্রতি সরাসরি বিরোধিতা করে তার উপর আক্রমণ করেছে। সেক্ষেত্রেও তিনি তা প্রতিহত করেছেন মাত্র। সাধারণত কোন সম্রাট বা শাসক নিজে যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি অংশগ্রহণ করে না। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সমরনায়ক এবং অকুতভয় বীর যোদ্ধা। তিনি সৈন্যদলের পেছনে না থেকে সরাসরি শত্রুদের মাঝে গিয়ে যুদ্ধ করেছেন। একই সাথে আবার তিনি ছিলেন শান্ত, মার্জিত এবং সকলের প্রতি আন্তরিক। একজন শাসকের যা যা দায়িত্ব থাকে দিনের বেলায় তিনি সেই সকল কাজ করতেন। এছাড়া রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন। বিচারকের দায়িত্ব পালন করতেন। অতিথিদের
সাথে সাক্ষাৎ করতেন। দরিদ্রদের খাবার দিতেন, অসুস্থকে দেখতে যেতেন। নিজের ব্যক্তিগত কাজ নিজেই করতেন। একজন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে একজন শাসক যা যা কাজ করে তিনি তার সবই করতেন। এরপর রাতের বেলা তিনি দীর্ঘ প্রার্থনায় মনোনিবেশ করতেন। প্রতি রাতে একটানা চারপাঁচ ঘন্টা নামাজে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তার পা ফুলে যেত। কিন্তু পরের দিন সকাল থেকে আবারো ইসলামী জীবনবিধান শিক্ষা দেওয়া পবিত্র কুরআন ব্যাখ্যা করা সহ যাবতীয় কাজ নিরালসভাবে করে যেতেন। একজন মানুষ কিভাবে একসাথে সবগুলো কাজ সঠিকভাবে করতে পারে। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন উৎকর্ষতার চূড়ান্ত উদাহরণ। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া ইতিহাসে এমন নজির
আর দ্বিতীয়টি নেই। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার শাসনামলে একজন রাজা আর একজন দাসের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। তিনি ধনী গরীব নির্বিশেষে সবাইকে এক কাতারে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। পশ্চিমারা আজীবন বর্ণবাদের কুচিত চর্চা করে সাম্প্রতিক সময়ে খুব সাধু সাজার চেষ্টা করে। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণবাদ বিলুপ্ত করেছিলেন আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে তিনি সেই প্রাচীনকালেই বলে গেছেন কালোর উপর সাদার কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই শুধু তাই নয় তৎকালীন সময়ে সারা পৃথিবীতে নারী অধিকার ছিল উপেক্ষিত নারীদেরকে অনেকাংশে মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না সেখানে তিনি নারীদেরকে সম্পত্তি লাভের অধিকার প্রদান সহ নানান ক্ষেত্রে নারী
অধিকার নিশ্চিত করেছেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম তার জীবনে কখনো কোনদিন মিথ্যা কথা বলেননি কিন্তু এই মহামানবের প্রতি সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার হলো তিনি নাকি পবিত্র কুরআন নিজে রচনা করেছেন। অথচ তিনি পড়ালেখা জানতেন না। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় কুরআন তার রচনা সেক্ষেত্রে এই গ্রন্থ জুড়ে তার নিজের গুণগান বেশি বেশি থাকার কথা ছিল। কিন্তু পবিত্র কুরআনে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এর বর্ণনার চেয়ে ইহুদি ধর্মের নবী হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম এবং খ্রিস্টান ধর্মের নবী হযরত ঈসা আলাইহিস সাল্লাম বা যিশুখ্রীস্টের বর্ণনাই কুরআনে বেশি এসেছে। মুসলিম এবং অমুসলিম সকলেরই উচিত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আরো গভীরভাবে
জানার চেষ্টা করা। কেউ যদি মুক্ত মনে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম সম্পর্কে অধ্যয়ন করে তাহলে এই মহামানবের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জাগবেই। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ যে ব্যক্তি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবে, সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসারী হতে বাধ্য। আমাদের সকলেরই উচিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মানবের জীবন এবং কর্মকে অনুধাবন করে তাকে তার যোগ্য সম্মানটুকু দেওয়া। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামকে শুধু একটি ধর্ম নয় রাষ্ট্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার অন্তর্ধানের পর ইসলামী সরকার ব্যবস্থা যেভাবে পরিচালিত হয়েছে তাকে বলা হয় খিলাফত। খিলাফত সরকার ব্যবস্থার প্রধান হলেন একজন খলিফা। 632 সালে হযরত আবু
বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে শুরু করে 1924 সালে সর্বশেষ অটমান খলিফা পর্যন্ত প্রায় 1300 বছর খিলাফত শাসন ব্যবস্থা কায়েম ছিল। এই সুদীর্ঘ সময়ে খলিফা উপাধির কার্যকরী ব্যবহারের পাশাপাশি বহু অপব্যবহারও হয়েছে। ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একই সাথে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এবং ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রনায়ক। তার চলে যাবার পর এই দুটি মহান গুণ কোন এক ব্যক্তির মধ্যে খুঁজে পাওয়াটা ছিল অসম্ভব। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের একতা ধরে রাখার জন্য এবং ইসলামকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একজন নেতা নির্বাচন করাটা ছিল অতি জরুরি। সেজন্যই একজন খলিফার অধীনে খিলাফত ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটে। খলিফা শব্দের আভিধানিক অর্থ হল উত্তরাধিকারী বা প্রতিনিধিত্বকারী।
ইসলামী পরিভাষায় খলিফা হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি যাবতীয় বিষয়ে শরীয়ত অনুযায়ী সমস্ত উম্মতকে পরিচালিত করেন। সেজন্য তাকে বলা হয় খলিফাতুন রাসূলুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর রাসূলের উত্তরাধিকারী। খলিফা হবার জন্য কয়েকটি যোগ্যতা এবং শর্ত রয়েছে। প্রধান কয়েকটি শর্ত হলো মুসলিম হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, নেতৃত্ব গ্রহণের প্রতি আগ্রহ না থাকা, পুরুষ হওয়া, স্বাধীন হওয়া, ন্যায়পরায়ণ হওয়া, বিবেক সম্পন্ন হওয়া, ইলম বা জ্ঞান থাকা, সুন্নতের অনুসারী হওয়া এবং উম্মাদরী হওয়া। খলিফা নিযুক্ত করার পদ্ধতি দুইটি। পূর্বের খলিফা দ্বারা নিযুক্ত হওয়া অথবা শীর্ষ ইসলামী পন্ডিতদের দ্বারা নিযুক্ত হওয়া। খলিফার কাছে মুসলিমদের বায়াত গ্রহণ খিলাফতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বায়াত অর্থ হলো আল্লাহর অবাধ্যতা ছাড়া সকল
ক্ষেত্রে খলিফার আনুগত্য করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া। কারণ ইসলামী রাষ্ট্রে খলিফা হলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে গভর্নর, শাসক, নেতা, কাজী এবং সেনাপতি নিযুক্ত [মিউজিক] করেন। প্রথম চারজন খলিফাকে বলা হয় খোলাফায়ে রাশেদীন। যার অর্থ হল ন্যায় পরায়ণ সঠিক পথনির্দেশপ্রাপ্ত খলিফা। প্রথম খোলাফায়ে রাশেদীন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু 632 থেকে 634 সাল পর্যন্ত মাত্র দুই বছর খলিফার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন করে মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন। এরপর ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু 634 থেকে 644 সাল পর্যন্ত 10 বছর খেলাফত পরিচালনা করেন। তার সময়েই মূলত ইসলামী শাসনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। খলিফা ওমরের
নেতৃত্বে পারস্য এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মতো তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তিকে মুসলিমরা দমন করতে সক্ষম হয়। খলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর আমলেই মুসলিমরা পবিত্র জেরুজালেম শহরের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। উনার পরে উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু 644 সাল থেকে 656 সাল পর্যন্ত 12 বছর ইসলামী সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন। তার সময়ে ইসলামী খিলাফত তৎকালীন খোরাসান বা বর্তমান আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এরপর আলী ইবনে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু 656 থেকে 661 সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর খলিফার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি খিলাফতের রাজধানী মদিনা থেকে ইরাকের কুফায় স্থানান্তর করেছিলেন। অনেকে তার পুত্র হাসান ইবনে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকেও খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করে। খোলাফায়ে
রাসাদীনের চার খলিফার মধ্যে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বাদে বাকি তিন জনই হত্যার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে শুধু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু অ-মুসলিমের হাতে খুন হন। বাকি দুজনকে মুসলিম বিদ্রোহীরা হত্যা করেছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তর্ধানের মাত্র তিন দশক পরেই প্রকৃত কুরআনের শাসন বাধাপ্রাপ্ত হয়। ইসলামী শাসনের পরিধি বিস্তৃত হবার সাথে সাথে মুসলিমরা নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু করেছিল। প্রচুর ক্ষমতা আর অর্থবিত্ত্বের কারণে খলিফা পদ গ্রহণের জন্য প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক চক্রান্ত নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। খোলাফায়ে রাশেদীনের পর মুসলিমদের নেতৃত্ব দিতে উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে খিলাফত আর সম্পূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থাকে না। প্রথম উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়া তার
পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে। এটি ছিল খলিফা নির্বাচনের প্রচলিত ধারায় বিশাল কুঠার আঘাত। এর ফলে খিলাফাত ব্যবস্থা এক ধরনের রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। আর খলিফা হয়ে যায় অনেকটা সম্রাটের মতো। উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী ছিল দামেস্ক। যা বর্তমানে সিরিয়ার রাজধানী। 661 থেকে 750 সাল পর্যন্ত 14 জন খলিফা প্রায় 90 বছর শাসনের পর উমাইয়া খিলাফতের পতন হয়। এরপর যাত্রা শুরু হয় আব্বাসীয় খিলাফাতের। আব্বাসীয় শাসকগণ 750 থেকে 1258 সাল পর্যন্ত প্রায় 508 বছর খিলাফত কায়েম রাখতে সক্ষম হয়। আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী ছিল বাগদাদ। প্রায় 500 বছরের 37 জন শাসকের ক্ষমতার পালা বদলে আব্বাসীয় খেলাফতের পতন ঘটে। শেষের দিকে আব্বাসীয় শাসকেরা সুলতানসহ
অন্যান্য কিছু উপাধি গ্রহণ করেন। আব্বাসীয় খেলাফতের পরে 1261 সালে আসে মামলুক আব্বাসীয় রাজবংশ। মিশরের কায়রোভিত্তিক এই রাজবংশ প্রায় 256 বছর রাজত্ব করে। 1261 থেকে 1517 সাল পর্যন্ত 17 জন শাসক এই খিলাফত পরিচালনা করেছেন। মামলুক সালতানাতের পর ক্ষমতায় আসে উসমানীয় খিলাফত। 1514 থেকে 1924 সাল পর্যন্ত প্রায় 407 বছর উসমানীয় খিলাফাত বজায় ছিল। উসমানীয় খিলাফতের শাসকদের সুলতান নামে ডাকা হতো। প্রায় 30 জন শাসক উসমানীয় খিলাফত ব্যবস্থায় খলিফার দায়িত্ব পালন করেছেন। [মিউজিক] প্রধান পাঁচটি বৈশ্বিক খিলাফত ছাড়াও বেশ কিছু আঞ্চলিক খিলাফতেরও নজির রয়েছে। সেগুলো হল আব্দুল্লাহ ইবনুল জুবায়রের খিলাফত, কর্ডোভার উমাইয়া খিলাফত, ফাতেমীয় খিলাফত, আল মোহাদ খিলাফত এবং শরীফীয়
খিলাফত। এসব খেলাফতের আমলে খলিফা নির্বাচন প্রক্রিয়া বংশ পরম্পরায় হয়ে আসলেও অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামী শাসনের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্য কোন জাতির শাসক অসৎ হলেও সেই মন্দ শাসকের জন্য সমগ্র জাতিকে দোষারোপ করা হয় না। অথচ ইসলামী খেলাফতের কোন খলিফার যদি নূন্যতম নৈতিক স্খলন ঘটে থাকে তবে তার জন্য সমগ্র মুসলিম জাতি এবং ইসলাম ধর্মকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। ইসলামী খেলাফতের নামে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালে। একটি সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামী স্টেট অফ ইরাক এন্ড লেভান্ট বা আই এল গড়ে তোলে। যা আইসেস নামেও পরিচিত। এর মাধ্যমে তারা ইসলামী খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানায় এবং আবু বকর আল বাগদাদী নামের এক
ব্যক্তিকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ মুসলিমই এই খিলাফতকে প্রত্যাখ্যান করে। মুসলিম নামধারী এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কারণে ব্যাপক সহিংসতা, রাজনৈতিক দাঙ্গা হাঙ্গামা এবং বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপে ইরাক এবং সিরিয়া নরকে পরিণত হয়। ইসলামী স্টেট বা আইএস মূলত পবিত্র কুরআনের অপব্যাখ্যা দিয়ে মুসলিমদের শান্তিপ্রিয় ধর্মটাকেই ছিন্তাই করেছে। ওদের কর্মকাণ্ডের সাথে ইসলামের নূন্যতম সম্পর্ক নেই। ইসলামের ছদ্মবেশি এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কারণে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইএস এর কারণে পৃথিবীতে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলাম ভীতি মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। মনে রাখা উচিত একজন যোগ্য খলিফা সবসময় নিজেকে অযোগ্য মনে করবেন এবং খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের ব্যাপারে তার আগ্রহই থাকবে না।
সেই সাথে এই গুরু দায়িত্ব বহনের জন্য মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয় করবেন। আইএস এর মতোই বর্তমান যুগের ধর্ম ব্যবসায়ীরাও ইসলামের প্রকৃত আদর্শ থেকে যোজন যোজন দূরে রয়েছে। সে কারণেই তাদের সহিংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আর যাই হোক খিলাফতের মত পবিত্র শাসন ব্যবস্থা কায়েম অষ্টম শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিমদের হাত ধরে বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সময়কে ইসলামী স্বর্ণযুগ বলা হয়। সে সময় মুসলমানদের দ্বারা নতুন নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা উদ্ভাবিত না হলে আজকের পৃথিবীটা সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো। পদার্থ, রসায়ন, গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, স্থাপত্য, মনস্তত্ব থেকে শুরু করে সাহিত্য, শিল্পকলা বা দর্শন, জ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেখানে
মুসলিম মনীষীরা অবদান রাখেননি। আজকের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং কম্পিউটার ভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি, মুসলিম বিজ্ঞানীদের গবেষণার উপর সরাসরি নির্ভরশীল। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন জায়গায় জ্ঞান অর্জনের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন সময়ের মুসলিম গবেষক ও বিজ্ঞানীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই জ্ঞানের প্রায় সকল শাখায় অনুসন্ধান চালিয়েছেন। পশ্চিমারা বলে পঞ্চম শতক থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত প্রায় 1000 বছর পৃথিবীর ইতিহাসে এক অন্ধকার যুগ। এরপর ইউরোপীয় রেনেসার মাধ্যমে পৃথিবী আবারো উন্নতির শিখরে পৌঁছায়| প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগে মুসলিমরা যে জ্ঞানের চর্চা করেছিল তার ভিত্তিতেই পরবর্তী যুগের বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছে। ইউরোপ মহাদেশ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখন মধ্যপ্রাচ্যে চলছিল বিজ্ঞান চর্চার স্বর্ণযুগ।
ইসলামী স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র ছিল বায়তুল হিকমা বা হাউস অফ উইজডম। অষ্টম শতকে আব্বাসীয় খেলাফতের সময় খলিফা হারুনুর রশিদ ইরাকের বাগদাদে এই জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই লাইব্রেরিতে অসংখ্য পন্ডিত গবেষণা করেছেন। বায়তুল হিকমা কোন সাধারণ লাইব্রেরি ছিল না। এখানে গ্রিক, পারস্য, ভারতীয়, চীনা, মিশরীয় সহ পৃথিবীর সকল অঞ্চলের প্রাচীন জ্ঞান, সংরক্ষণ, অনুবাদ এবং শিক্ষা দেওয়া হতো। তৎকালীন মুসলিম পন্ডিতদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফলেই পৃথিবীর সকল সভ্যতার জ্ঞানকে একত্রিত করা গেছে। মানবজাতির জ্ঞান চর্চার ইতিহাসে এর সাথে আর অন্য কোন কিছুর তুলনা চলে না। বিভিন্ন ভাষার পান্ডুলিপির অনুবাদ এবং মৌলিক গবেষণায় এত বিপুল পরিমাণ অর্থ
ব্যয় করা হয়েছে যে বর্তমান যুগে আমেরিকার মত উন্নত দেশেও গবেষণার পেছনে এত টাকা খরচ করা হয় না। তখনকার পন্ডিতদের বেতন বর্তমানকালের শীর্ষ গবেষকদের চেয়েও অনেক বেশি ছিল। ভারত, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ তথা বিশ্বের সকল প্রান্তের জাত, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে জ্ঞানীগুণীরা এখানে জ্ঞান চর্চার জন্য আসতো। কথিত আছে কেউ কোন জ্ঞানের বই নিয়ে আসলে তাকে সেই পান্ডুলিপির সমপরিমাণ ওজনের স্মরণও দেওয়া হতো। তৎকালীন খিলাফত রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই পন্ডিতরা বহু মৌলিক আবিষ্কারে সফলতা খুঁজে পান। 1258 সালে কুখ্যাত হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গলবাহিনী বাগদাদ শহর অবরোধের সময় বায়তুল হিকমা ধ্বংস হয়ে [মিউজিক] যায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মুসলিম গবেষকদের
হাত ধরে। 805 সালে বাগদাদে পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল তৈরি করেছিল মুসলিমরা। 24 ঘন্টা হাসপাতাল খোলা রাখা এবং দরিদ্রদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ধারণা মুসলিমদের আবিষ্কার। সেই সময় মিশরের কালাউন হাসপাতালে দৈনিক প্রায় 4000 রোগী বিনামূল্যে চিকিৎসা গ্রহণ করত। বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসক আবুল কাসিম আল জাহরাই কে সল্য চিকিৎসার জনক বলা হয়। এক হাজার সালের দিকে তিনি দেড় হাজার পৃষ্ঠার মেডিকেল সার্জারির উপর একটি সচিত্র বই প্রকাশ করেন। পরবর্তী 500 বছর ইউরোপের মেডিকেল রেফারেন্স হিসেবে বইটি ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মেডিকেল অপারেশনের জন্য তিনি যেসব অস্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন তার বেশিরভাগই ডাক্তাররা আজও ব্যবহার করে। আল জাহরাাউ সর্বপ্রথম সিজারিয়ান অপারেশন করেছিলেন। ইসলামী
স্বর্ণযুগের আরেক মনীষী আবু আলী হুসাইন ইবনে সিনা। ইবনে সিনা আধুনিক ওষুধের জনক। তিনি একাধারে ছিলেন চিকিৎসক, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং দার্শনিক। ইবনে সিনা রচিত কানুন ফিত্তিব বইটি চিকিৎসাশাস্ত্রের বিশ্বকোষ হিসেবে পরিচিত। পাঁচ খন্ডের এই বই 19 শতক পর্যন্ত প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের প্রায় সকল মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র এবং ধর্মতত্ত্বেও ইবনে সিনার বেশ দখল ছিল। আরবিতে ইবনে সিনাকে শাইখুল রাইস বা জ্ঞানীকুলের শিরোমণি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আরেক বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী হলেন আবু বকর মোহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল রাজি। তিনি প্রথম শিশুর রোগ বিশেষজ্ঞ। আল রাজি একাধারে চিকিৎসক, পদার্থবিদ, রসায়নবিদ এবং ইসলামী চিন্তাবিদ
ছিলেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য তিনি 99 শতাংশ বিশুদ্ধ ইথাইল অ্যালকোহল আবিষ্কার করেছিলেন। আলরাজি সালফিউরিক এসিডেরও আবিষ্কারক। বর্তমান পৃথিবীতে কৃত্রিমভাবে প্রস্তুতকৃত রাসায়নিক যৌগ সমূহের মধ্যে সালফিউরিক এসিড সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করা হয়। রাসায়নিক সার, ডিটারজেন্ট, কাগজ শিল্প, গাড়ির ব্যাটারি, কীটনাশক, বারুদ, দিয়াসলাই এবং খনিজ তেল পরিশোধনের মত অসংখ্য কাজে সালফিউরিক এসিডের ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়া বিশ্বের প্রথম চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন একজন মুসলিম। তার নাম আলী ইবনে আল আব্বাস আল মাজুসি। গণিতশাস্ত্রে মুসলিমদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা বর্ণনাতিত। আলজেব্রা বা বীজগণিতের জনক মোহাম্মদ বিন মুসা আল খোয়ারিজমী। আল খোয়ারিজমি একাধারে ছিলেন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, ভূগোলবিদ এবং মানচিত্র অঙ্কন বিশারদ। তিনি বায়তুল হিকমার পরিচালকও ছিলেন।
নবম শতকে আল-খোয়ারিজমি কিতাব আল-যাবর ওয়াল মোকাবেলা নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইতে মূলদ সংখ্যা, অমূলদ সংখ্যা, দ্বিঘাত সমীকরণ এবং জ্যামেতিক মাত্রার সমন্বয় সাধন করা হয়। পাটিগণিতের উপরে লেখা তার আরেকটি বইয়ে তিনি দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি চালু করেন। আল খোয়ারিজমি ভারতীয় এবং আরবি সংখ্যাতত্ত্বের সাথে পশ্চিমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। এর মাধ্যমে রোমানদের উদ্ভট সংখ্যা ব্যবস্থার বিলুপ্তি হয়। আলখোয়ারিজমির লেখা বইগুলো 16 শতক পর্যন্ত ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণিতের প্রধান পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আলখোয়ারিজমি অ্যালগরিদমেরও জনক। জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধানের সহজ পদ্ধতি হল অ্যালগরিদম। অ্যালগোরিদম আবিষ্কার না হলে আধুনিক কম্পিউটার থেকে শুরু করে স্মার্টফোন পর্যন্ত কোন কিছুই তৈরি করা সম্ভব হতো
না। বিংশ শতকে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং চিন্তা করেন অ্যালগরিদমের তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে একটি মেশিন তৈরি করা যায় যা দিয়ে জটিল গাণিতিক সমস্যার সহজ সমাধান করা যাবে। আর এর মাধ্যমেই কম্পিউটার যুগের সূচনা হয়। আল খোয়ারিজমীর সুরত আল আরদ গ্রন্থটি পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ত্রিকোণমিতি এবং বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার বিষয়েও পন্ডিত ছিলেন। পদার্থবিদ্যার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অপটিক বা আলোকবিদ্যার জনক হাসান ইবনে আল হাইসাম। বহুবিদ্যা বিশারদ আল হাইসাম একাধারে ছিলেন পদার্থবিদ, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক। বিভিন্ন বিষয়ের উপর তিনি দুই শতাধিক বই রচনা করেছেন। ইউরোপীয় রেনেসার পন্ডিতদের 600 বছর আগেই পরীক্ষা নির্ভর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের
কারণে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। তার সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজ হচ্ছে, সাত খন্ডের গ্রন্থ কিতাব আল মানাযির। এক হাজার সালে তিনি মানুষের চোখের দৃষ্টি সংক্রান্ত যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। তার আবিষ্কারের মাধ্যমে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ইউক্লিড এবং টলেমির তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়। এই বিখ্যাত পদার্থবিদ শুধু তত্ত্ব আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত হননি। মানুষের চোখ কিভাবে কাজ করে তার প্রায়োগিক ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি আবিষ্কার করেন ক্যামেরা অবস্কিউরা। এই ক্যামেরা অবস্কিউরা মডেলের উপর ভিত্তি করেই আধুনিক ক্যামেরা তৈরি করা হয়েছে। ইবনে আল হাইসাম লেন্স নিয়েও বহু গবেষণা করেছেন। ম্যাগনিফাইং গ্লাস বা বিবর্ধক কাজ তারই আবিষ্কার। এছাড়া মহাকাশবিদ্যা, জ্যামিতি, সংখ্যাতত্ত্ব, ক্যালকুলাস এবং গতিবিদ্যায়ও তার পারদর্শিতা [মিউজিক] ছিল।
বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা, রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান। তিনিও একাধারে ছিলেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পদার্থবিদ, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ। জাবির ইবনে হাইয়ান 3000 এর বেশি নিবন্ধ রচনা করেছেন। ধাতু পরিশোধন, তরলীকরণ, বাষ্পীকরণ, এসিড সংশ্লেষণ, পাতন, কেলাসিকরণ, রাসায়নিক সংখ্যায়ন পদ্ধতিসহ রসায়ন শাস্ত্রের বহু বিষয় তিনি আবিষ্কার করেন। তিনি সর্বপ্রথম ইস্পাত আবিষ্কার করেছিলেন। সত্যিকারের বৈশ্বিক সভ্যতা মুসলিমরাই তৈরি করেছিল। হজের সময় সারা বিশ্বের মুসলিমদের মিলনমেলা ঘটতো। সেখানে তারা নিজস্ব চিন্তা ও আঞ্চলিক জ্ঞান আদান-প্রদান করত। এছাড়া আরব বনিকেরা পৃথিবীর সকল মহাদেশে ব্যবসার কাজে গিয়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞান সংগ্রহ করে আনতেন। 751 খ্রিস্টাব্দে চীনাদের কাছ থেকে মুসলিমরা কাগজ তৈরির পদ্ধতি শিখে। এরপর মুসলিমদের হাত ধরে কাগজের
আরো উন্নতি হতে থাকে। পরবর্তীতে মুসলিমরাই সর্বপ্রথম পুরোদস্তুর পেপারমিল বা কাগজ কল প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানেও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হল আল কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়। 859 সালে মরক্কোর ফেজ শহরে একটি মসজিদ সহ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো লাইব্রেরীটিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে। 970 সালে ফাতেমী ও খেলাফতের আমলে মিশরে স্থাপিত আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী স্বর্ণযুগের আরেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কেন্দ্র। মাদ্রাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও 1962 সালে আল আযহার পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। আধুনিক যুগের পাবলিক লাইব্রেরির ধারণাও এসেছিল ইসলামী স্বর্ণযুগের গ্রন্থাগার গুলো থেকে। দ্বাদশ শতকের আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী ইসমাইল আল জাজারী অটোমেশন এবং রোবটিক্স এর
জনক। তিনি ক্র্যাঙ্কশফট আবিষ্কার করেছিলেন। ক্র্যাঙ্কের সাহায্যে ভারী কোন বস্তুকেও অনায়াসে টেনে তোলা যায়। তার এই আবিষ্কার সারা পৃথিবীতে বিস্ফোরণের মত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি এই আবিষ্কার না করলে বাইসাইকেল থেকে শুরু করে আধুনিক মোটর গাড়ির ইঞ্জিন পর্যন্ত কোন কিছুই তৈরি করা সম্ভব হতো না। গণিতবিদ মোহাম্মদ আল ফাজারি প্রাচীন মহাকাশ ঘড়ির ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। একে মধ্যযুগের জিপিএস বললেও ভুল হবে না। এই যন্ত্রের সাহায্যে মহাকাশে তারকারাজির অবস্থান নির্ণয় এবং দিক নির্ণয় করা যেত। নামাজের কিবলা নির্ধারণ করতে যন্ত্রটির বহুল ব্যবহার হয়েছে। ভূগোলবিদ ও মানচিত্র অঙ্কন বিশারদ মোহাম্মদ আল ইদ্রিস বিশ্ব মানচিত্রের জনক। তিনি তাবুলা রোজারিয়ানা নামে মধ্যযুগের সেরা মানচিত্রটি
তৈরি করেছিলেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের সময় এবং ভাস্কোডাগামা ভারতের জলপথ আবিষ্কারের সময় এই মানচিত্রটি ব্যবহার করেছিল। দশম শতকে আহমেদ আল হাসান প্রাচীন উইন্ডমিল বা বায়ুকলের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। এই যন্ত্র বিভিন্ন ধরনের শস্য পেশার কাজে এবং উপরদিকে পানি টানার জন্য ব্যবহৃত হতো। দ্বাদশ শতকে ইউরোপিয়ানরা এখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই আধুনিক উইন্ড মিল তৈরি করেছে। মানুষের উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন প্রথম বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। নবম শতকে স্পেনের করডোভা শহরে তিনি কয়েক মিনিট উড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মাটিতে পড়ে গিয়ে তার কোমর ভেঙে ফেলেন। তার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলেও তার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিখ্যাত ইতালিয়ান
শিল্পী লিওনার্দোদা ভিঞ্চি হাওয়াই জাহাজের নকশা একেছিলেন। ইসলামী স্বর্ণযুগের বহু মুসলিম মনীষী তাদের নিজেদের কর্মের দ্বারা বিশ্ববাসীকে ঋণী করে গেছেন। তেমনি আরো কিছু উল্লেখযোগ্য নাম হল সমাজবিজ্ঞানের জনক ইবনে খালদুন ত্রিকোণমিতির জনক নাসির আল দিন তুসি, পদার্থবিদ, ভূ-গণিতবিদ এবং প্রথম নৃতাত্ত্বিক আলবিরুনিী, মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদের জনক ইবনে রুশ, দার্শনিক আল ফারাবি, চিকিৎসক ও জীববিজ্ঞানী ইবনে আন নাফিস, চিন্তাবিদ আল কিন্, শিক্ষাবিদ ইমাম গাজ্জালী, জ্ঞানতাত্ত্বিক ইবনে তুফায়েল, মহাকাশ বিজ্ঞানী আব্দুর রহমান আল সুফি প্রকৌশলী তিন ভাই আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে মুসা, আবুল কাসিম আহমদ ইবনে মুসা এবং আল হাসান ইবনে মুসা প্রমুখ। এই সমস্ত কিছুই হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ইসলামী স্বর্ণযুগে মুসলিমদের আবিষ্কারের
খুব সামান্য অংশই এই ভিডিওতে বর্ণনা করা গেছে। সকল মুসলিম পন্ডিত এবং তাদের গবেষণার বিষয়ের শুধু নাম বলতে গেলেও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এছাড়া মুসলিমদের নাম ল্যাটিন ভাষায় রূপান্তরের মাধ্যমে| তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে অপরিচিত করে ফেলা হয়েছে। আলখরিজমির নাম করা হয় আলগরিদমি ইবনে সিনাকে বলা হয় আভিসিনা, আল হাইসামের নাম হয়ে যায় আল হাজেন ইত্যাদি। আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীদেরকে আমরা যতটুকু সম্মান দেই ইসলামী স্বর্ণযুগের বিজ্ঞানীরা তার সামান্য পরিমাণ স্বীকৃতিও পায় না। অথচ মুসলিম মনীষীদের গবেষণা ব্যতীত আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তি গড়ে উঠতো না। ইউরোপ মহাদেশের একটি বিশেষ অংশ হল আইবেরিয়ান উপদ্বীপ। এই উপদ্বীপে ইউরোপিয়ান দেশ স্পেন ও পর্তুগালের অবস্থান। অতীতে প্রায়
800 বছর মুসলিমরা আইবেরিয়ান উপদ্বীপ শাসন করেছে। মুসলিম শাসিত এই অঞ্চলকে আন্দালুস নামে ডাকা হতো। ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অধীনেই আন্দালুস সহ সমগ্র ইউরোপ উন্নত সভ্যতার ছোঁয়া পেয়েছিল। সেজন্য আন্দালুসের রাজধানী কর্ডোভা ইউরোপের বাতিঘর নামে পরিচিত ছিল। সপ্তম শতকের প্রথমদিকে রডারিক নামের এক অত্যাচারী খ্রিস্টান শাসক স্পেন শাসন করত| তখন জুলিয়ান নামের এক নিপীড়িত খ্রিস্টান পাদ্রী উত্তর আফ্রিকার গভর্নর মুসা ইবনে নুসাইরের কাছে রডারিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায়। মুসা ইবনে নুসাইর স্পেনের অত্যাচারিত জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং তার বিখ্যাত সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদকে স্পেন বিজয় করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন। সেনাপ্রধান তারিক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে স্পেনের একটি পাহাড়ি উপকূলে
এসে পৌঁছায়। এই জায়গার নাম রাখা হয় জাবালাল তারিক। পরবর্তীতে জাবালাল তারিক শব্দটি বিকৃত হয়ে জিব্রালটার হয়ে যায়। এবং এই সামুদ্রিক অংশের নাম হয় জিব্রালটার প্রণালী। মাত্র 12,000 মুসলিম সেনা প্রায় 1 লক্ষ খ্রিস্টান সৈন্যের বিরুদ্ধে প্রাণপন লড়াই করে বিজয় অর্জন করে। 71 সালে মুসলিমদের সেই বিজয়ের ফলে তৎকালীন স্পেনের অধিবাসীরা রডারিক এর দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তখন মুসলিমরা সবাইকে আপন করে নিয়েছিল। কারণ তারা বিশ্বাস করত সমগ্র বিশ্ববাসী এক আল্লাহর সৃষ্টি এবং সবাই মাত্র একটি পরিবার থেকে উদ্ভূত। আন্দালুসে মুসলিম শাসন সমগ্র ইউরোপে উন্নত সভ্যতা গড়ে তুলতে ব্যাপক অবদান রাখে। জমকালো শহর, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, প্রশস্ত রাস্তা,
সড়কবাতি, মনোরম উদ্যান, কৃত্রিম ঝরণা ইত্যাদি বিষয়ের সাথে পশ্চিমাদের পরিচয় করিয়েছিল মুসলিমরা। এছাড়া দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য অসংখ্য বিষয় মুসলিমদের আগমনের পূর্বে আন্দালুস সহ সমগ্র ইউরোপের লোকেরা জানতোই না। যেমন কাগজ, তুলা, সুতিকাপড়, রেশম, রুমাল, সুগন্ধি, কাচের আয়না, রঙিন কাচ, লবণ-মরিচ, সাবান, কেরোসিন, আগ্নেয়াস্ত্র, উইন্ডমিল, বই বাধাই, পোস্টাল স্ট্যাম্প, চশমা, ঘড়ি, কম্পাস, গ্লোব, ফ্লাস্ক, কার্পেট, মেডিকেল অপারেশনের সরঞ্জাম, কৃত্রিম দাঁত, তরমুজ, লেবু জাতীয় ফল এবং বহু ঔষধী বৃক্ষ। মুসলিমরা জিব্রালটার অতিক্রম করার পর লেবু জাতীয় গাছ রোপণ করেছিল। এখানে অন্য যেকোনো ফসলের তুলনায় লেবু জাতীয় ফলগুলো ভালো উৎপাদিত হচ্ছিল বলে তারা এই অঞ্চলকে ডাকতো আরদুল বুর্তাগাল নামে। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে সেই বুরগাল
থেকেই আজকের পর্তুগাল নামটি এসেছে। খ্রিষ্টীয় এক সালের দিকে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র 30 কোটির রকম। সেই সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহর ছিল কর্ডোভা। দ্বিতীয় ছিল চীনের কেইফ্যাং তৃতীয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের কনস্ট্যান্টিনোপল চতুর্থ কম্বোডিয়ার অঙ্কর পঞ্চম জাপানের কিওটো ষষ্ঠ ফাতেমীয় খিলাফতের রাজধানী কায়রো সপ্তম বাগদাদ অষ্টম ইরানের নিসাবুর নবম আরবের আলহাসা এবং দশম পারস্যের ইস্পাহান তৎকালীন বিশ্বের শীর্ষ 10টি শহরের মধ্যে ছয়টি ছিল বিভিন্ন ইসলামী শাসনের রাজধানী মুসলিমদের স্থাপিত উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, গ্রন্থাগার এবং সাংস্কৃতিক অবকাঠামো থেকে স্প্যানিশরা ব্যাপক উপকৃত হয়। বস্তুত আন্দালুস ছিল তৎকালীন বিশ্বের আন্তর্জাতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্র। আজকের যুগে মানুষ যেমন ইউরোপ ও আমেরিকায় উচ্চতর
শিক্ষা গ্রহণের জন্য যায়, তখনকার যুগে মানুষ উন্নত শিক্ষা অর্জন করতে ইসলামিক শহরগুলোতে ভিড় করতো। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা আন্দালুসের মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে আসতো। সেসব শিক্ষার্থীদের মধ্য দিয়েই মুসলিমদের জ্ঞান ও উদ্ভাবন সমগ্র ইউরোপ তথা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আলজেব্রা, জিওগ্রাফি, জিওলজি, বায়োলজি, বোটানি, জিওলজি, কার্টোগ্রাফি, কেমিস্ট্রি, কার্ডিওলজি, ডার্মাটোলজি, ইকোলজি, এমব্রিওলজি, গাইনোকোলজি, ফিজিওলজি, মেডিসিন, মেডিকেল ইথিক্স, মোটরোলজি, মিনারোলজি, অর্থোপেডিক্স, প্যাথোলজি, প্যারাসাইটোলজি, ফার্মাকোলজি, সাইকিয়াট্রি, সাইকোলজি, টক্সিকোলজি, ইউরোলজি, ইমারজেন্সি মেডিসিন, এথনোগ্রাফি, হর্টিকালচার ইত্যাদি বিষয়ে মুসলিম পন্ডিতদের অধীনে উন্নত শিক্ষা দান করা হতো। এতসব জ্ঞানের অধিকাংশ শাখার জনকও ছিল মুসলিমরা। শুধু ইসলামী শিক্ষাই নয় তারা অরিস্টোটল সক্রেটিসের মত অমুসলিম মনীষীদের জ্ঞানও শিক্ষার্থীদের মাঝে
ছড়িয়ে দিয়েছিল। আধুনিক সভ্যতা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রাচীন মিশরীয় গ্রিক ভেনিশিয় সভ্যতার গুণগান প্রচার করা হলেও মুসলিম সভ্যতার তেমন কোন স্বীকৃতিই নেই। 1000 সালের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহানগর কর্ডোভায় প্রায় 2 লক্ষ বাড়ি, 6000 মসজিদ, নয়টি পাবলিক বাথ, 50 টি হাসপাতাল এবং বিশাল বিশাল বাজার ছিল। সে সময় কর্ডোভায় প্রায় 15,000 তাঁতই ছিল। যারা উন্নত মানের বস্ত্র তৈরি করত। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের সবচেয়ে বড় উপাসনালয় ছিল কর্ডোভা মসজিদ। সেই যুগের কর্ডোভার মসজিদগুলোর নকশা আজও সারা পৃথিবীতে অনুসরণ করা হয়। তখন ইউরোপ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। কিন্তু কর্ণডোভা ছিল এক আলোকজ্জল শহর। শহরের যেকোনো দিকে গেলেই আলোকিত রাস্তা চোখে
পড়তো। শহরের ভেতরে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত চমৎকার। করডোভা ছাড়াও স্পেনের মুসলিমরা গ্রানাডায় জমকালো এক প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল। যার নাম কাসার আলহামরা। এই আলহামরা প্রাসাদটি বর্তমানেও পৃথিবীর এক বিস্ময় হিসেবে বিবেচিত। আন্দালুসে জ্ঞানের চর্চা এতটাই সুবিস্তৃত ছিল যে তৎকালীন খলিফার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতেও 4 লক্ষের বেশি বই ছিল। স্পেনের মুসলিম পন্ডিতদের ভেতরে ইবনে বাজ্জাহ, ইবনে রুশ, ইবনে তোফায়েল, ইবনুল খাতির, ইবনে খালদুন, আল বাকরী, আল মাজিনী, ইবনে জুবায়ের, ইবনে মাইমুন, গারীব ইবনে সাঈদ, ইবনে আব্বাস জাহারাভী, আব্বাস ইবনে ফিরনাস প্রমুখ পন্ডিতগণ নিজ নিজ শাখায় অসামান্য অবদান রাখেন। স্প্যানিশরা মধ্যযুগে যে শক্তিশালী নৌশক্তিতে পরিণত হয়েছিল তার পেছনেও মুসলিমদের অবদান রয়েছে। কারণ
জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য স্প্যানিশদের মুসলিমরাই শিখিয়েছিল। যে স্পেন ইসলাম ধর্ম, ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির কারণে উন্নতির শিখরে আরোহণ করেছিল, আজ সেই ইসলাম স্পেন থেকে অপসারিত। যাদের কারণে তারা উন্নতির শিখরে আরোহন করতে পেরেছে তাদের প্রতি নূন্যতম কৃতজ্ঞতা বোধটুকুও নেই| বরং ইসলামকে স্পেনের মাটি থেকে মুছে ফেলতে সকল রকমের অপচেষ্টা করা হয়েছে। স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসানের পর খ্রিস্টানরা অবশিষ্ট মুসলিম নাগরিকদের উপর ব্যাপক ধ্বংসযোজ্ঞ চালায়। এমন বর্বরতা আর হত্যাযজ্ঞের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। এছাড়া বহু মুসলিমদেরকে জোর করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়। অনেক মুসলিম স্থাপত্য ধ্বংস করা হয় এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই পুড়িয়ে ফেলা হয়।
আন্দালুস সহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বেই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার এতটা প্রসার ঘটেছিল যে সেই সময়টা ইসলামিক স্বর্ণ। বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের কাছে জমজমের পানি অতি বরকতময় ও পবিত্র। হাজার হাজার বছর আগে থেকে শুরু হয়ে আজও পর্যন্ত প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ এই পানি ব্যবহার করছে। বৈজ্ঞানিকভাবে জমজমের পানি পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ পানি হিসেবে স্বীকৃত। জমজম কুক নিয়ে বিশ্বের খ্যাতনামা গবেষকরা অত্যন্ত বিশ্বয় প্রকাশ করেছেন। তাদের গবেষণায় জমজমের পানির নানান উপকারী দিক উঠে এসেছে। জমজম কূপ পবিত্র কাবাঘর থেকে মাত্র 21 মিটার দূরত্বে অবস্থিত। কাবাঘরের সামনে হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিমের মাঝ বরাবর জমজম কূপের অবস্থান। বর্তমানে জমজম কূপটি মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে অবস্থিত। হাদিসে এই
পানির অশেষ কল্যাণ ও বরকতের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের হাদিস মতে ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও কল্যাণকর পানি জমজম কূপের পানি। এই পানি ক্ষুধার্থের জন্য খাদ্য ও রোগীর জন্য পথ। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা হতে বর্ণিত আরেকটি হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সঙ্গে থাকা পাত্রে এবং মশকে জমজমের পানি বহন করতেন। তিনি এই পানি অসুস্থদের উপর ছিটিয়ে দিতেন এবং তাদের পান করাতেন। জমজম কূপের পানির এই বিশেষত্ব বর্তমানে বিজ্ঞান দ্বারাও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। জমজমের পানি পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পানি। শুধু তাই নয় এর সমমান সম্পন্ন পানি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সাধারণত
যে কোনো কূপের পানি দীর্ঘদিন আবদ্ধ থাকার ফলে তার রং ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু হাজার হাজার বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও জমজমের পানি রয়েছে অবিকৃত। এর রং, স্বাদ ও বিশুদ্ধতায় সামান্য কোন পরিবর্তন আসেনি। শুধু তাই নয় এই পানিতে কোন জীবাণু, শৈবাল, ছত্রাক বা পানি দূষণকারী কোন ধরনের বস্তু টিকতে পারে না। কোন নদী বা জলাশয়ের সঙ্গে এই কূপের কোন সংযোগ নেই। অথচ প্রতি মুহূর্তে লাখ লাখ মানুষ এই পানি ব্যবহার করছে। আবার সাথে করে নিয়েও যাচ্ছে। তবুও জমজম কূপের পানি কখনো শেষ হয় না। জমজমের পানি নিয়ে এখনো পর্যন্ত বহু গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। সৌদি আরবের জিওলজিক্যাল
সার্ভের অধীনে জমজম স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ সেন্টার নামে আলাদা একটি গবেষণা কেন্দ্রই রয়েছে। যার কাজই হল জমজমের পানি নিয়ে গবেষণা করা। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে সাধারণ পানির তুলনায় জমজমের পানিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম সল্ট এর পরিমাণ সামান্য বেশি যা ক্লান্তি দূর করতে বিরাট ভূমিকা রাখে। ব্রিটিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে জমজমের পানি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি মাসারু এমাটো নামের জাপানি এক পানি গবেষক জমজমের পানি গবেষণা করে বলেছেন জমজমের এক ফোঁটা পানির যে নিজস্ব খনিজ গুনাগুন আছে তা পৃথিবীর অন্য কোন পানিতে নেই। তার গবেষণায় আরও দেখা
যায় পৃথিবীর সাধারণ পানির তুলনায় জমজমের পানি এক হাজার গুণ বিশুদ্ধ। আর তাই এক হাজার ফোঁটা সাধারণ পানির সাথে যদি এক ফোঁটা জমজমের পানি মেশানো হয় তাহলে সেই সাধারণ পানিও জমজমের পানির মতো বিশুদ্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ সাধারণ যেকোনো পানির সাথে জমজমের পানি মেশালে সেই পানিও জমজমের পানির গুনাগুন অর্জন করে। বিশ্বের অন্য কোন পানিতে এ ধরনের আচরণ লক্ষ্য করা যায় না। জার্মান বিজ্ঞানী নাটফিফারের গবেষণা মতে জমজমের পানি আশ্চর্যজনকভাবে দেহের সেল সিস্টেমের শক্তির মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। পানি বিশেষজ্ঞ ডক্টর ইয়াহিয়া খোশগে জমজম কূপের পানির বিশুদ্ধতা নির্ণয় করার জন্য আল্ট্রাভায়োলেট রশ্ি পরীক্ষা চালিয়েছেন। এই পরীক্ষার পর তিনি বলেন জমজমের পানিতে
কোন ধরনের দূষণকারী পদার্থ খুঁজে পাওয়া যায়নি। জমজমের পানিতে ফ্লোরাইডের উপস্থিতি থাকার কারণে এই পানির জীবাণুনাশক ক্ষমতাও রয়েছে। জমজমের পানি ফ্রেঞ্চ আলসের পানি থেকেও বিশুদ্ধ। ফ্রেঞ্চ আলফসের পানির প্রতি লিটারে বাইকার্বোনেটের পরিমাণ 357 মিলিগ্রাম এবং জমজমের পানির প্রতি লিটারে বাইকার্বনেটের পরিমাণ 366 মিলিগ্রাম। জমজম কূপের পানির রাসায়নিক গঠন অ্যালকালাইন প্রকৃতির। যা শরীরের অতিরিক্ত অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এছাড়া গ্যাস্ট্রিক আলসার ও হৃদযন্ত্রে গঠিত বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণ করে। আসা যাক জমজম কূপের গভীরতা মাত্র 101 ফুট। কূপের পানির স্তর মাটি থেকে প্রায় সাড়ে ফুট নিচে। দুইটি বিশাল আকারের পানির পাম্পের সাহায্যে প্রতি সেকেন্ডে 1100 লিটার থেকে 1850 লিটার পর্যন্ত পানি উত্তোলন
করা হয়। পানি উত্তোলন করার পর এর স্তর 44 ফুট নিচে নেমে যায়। কিন্তু পানি উঠানো বন্ধ করার মাত্র 11 মিনিট পরেই আবারো পানির স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসে। প্রতিদিন মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববী থেকে প্রায় 20 লক্ষ গ্লাস জমজমের পানি পান করা হয়। জমজমের পানির চাহিদা জ্যামিতি হারে বাড়তে থাকায় পানি সরবরাহে সৌদি কর্তৃপক্ষ রীতিমত হিমসিম খায়। তাই 2010 সালে মক্কার কাদাই এলাকায় জমজমের পানি সরবরাহের জন্য বিশাল এক প্রকল্প তৈরি করা হয়। সৌদি আরব সহ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে জমজমের পানি পৌঁছে দেয়ার জন্য এখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমজমের পানি বোতলজাত করা হয়। এখান থেকে প্রতিদিন 1 লক্ষ
5 হাজার লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু হজের মৌসুমে এই পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় দৈনিক চার লক্ষ লিটারে। এই প্রকল্প থেকে প্রতিদিন 10 লিটারের প্রায় 15 লক্ষ বোতল জমজমের পানি সংরক্ষণ করা হয়। এখান থেকে পরবর্তীতে বিশেষ ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে মদিনার মসজিদে নববী সহ সৌদি আরবের অন্যান্য স্থানে জমজমের পানি পৌঁছে দেয়া হয়। কিছু কিছু স্থানে জমজমের পানি শীতলীকরণ করেও পরিবেশন করা হয়। মুসল্লি ও দর্শনার্থীরা যাতে নিজেদের প্রয়োজনে জমজমের পানি নিয়ে যেতে পারে সেজন্য রয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। এছাড়া মক্কা ও মদিনার দুই মসজিদের মুসল্লীদের সুবিধার্থে বহু স্বেচ্ছাসেবক জমজমের পানি পিঠে বহন করে সরাসরি পরিবেশন করে। সেই সাথে বিভিন্ন ছোট ছোট
বোতল যাত্রকৃত পানিও সরবরাহ করা হয়। সৌদি আরব সহ অন্যান্য মুসলিম দেশে বাণিজ্যিকভাবে জমজমের পানি মজুদ ও কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দুই পবিত্র মসজিদের অসংখ্য কর্মী সাধারণ মানুষের কাছে জমজমের পানি পৌঁছে দেওয়া এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিরলস কাজ করে [মিউজিক] যাচ্ছে। জমজমের পানি সম্পর্কে অনেক আলোচনা হলো। এবার জমজমকুব সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে জানা যাক। আজ থেকে প্রায় 4000 বছর আগে ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তার প্রিয়তমা স্ত্রী হাজেরা ও আদরের শিশুপুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম কে মক্কার বিরান পাহাড়ি এলাকায় নির্বাসনে রেখে আসেন। এই নির্বাসন ছিল আল্লাহর আদেশ মোতাবেক সবচেয়ে প্রিয় কোন কিছুর কোরবানী। এক মশক পানি ও এক থলে খেজুর সহ
তাদেরকে বিরান মরুভূমিতে রেখে তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করেন| ফলে মক্কার বালুময় প্রান্তরে একাকি বসবাস করতে থাকেন মা হাজেরা ও তার শিশু ইসমাইল| তাদের স্বল্প রসদ অতি দ্রুতই ফুরিয়ে যায়| একদিন নিদারুণ পানির পিপাসায় শিশু পুত্র ইসমাইলকে খোলা প্রান্তরে রেখে মা হাজেরা সাফা মারওয়া পাহাড়ে ছোটাছুটি করতে থাকেন| তিনি সাতবার এদিক থেকে ওদিকে দৌড়ে বেড়ান| এক পর্যায়ে আল্লাহর হুকুমে হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম মরুভূমির ভেতর থেকে পানির ঝরণা প্রবাহিত করে দেন। মা হাজেরা পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামের কাছে এসে দেখেন এক অভূতপূর্ব ঘটনা। শিশুপুত্র ইসমাইলের পায়ের আঘাতে শুকনো জমিতে তৈরি হয়েছে বিশুদ্ধ পানির স্রোত। তখন মা হাজীরা পানির চারপাশে বালির
বাঁধ দিয়ে বললেন, জামজাম অর্থাৎ থেমে যাও। সেই থেকে এখনো পর্যন্ত জমজম খুব বহাল রয়েছে। এবং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে বলে মুসলিমদের দৃঢ় বিশ্বাস। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম নিজ হাতে আজোয়া খেজুর গাছ রোপণ করেছিলেন। সে সময় খেজুরের বীজ রোপণ ও আজোয়া খেজুর জন্মের পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। আর সে কারণেই অন্যান্য খেজুরের তুলনায় আজোয়া খেজুরকে বিশেষ বরকতময় মনে করা হয়। আজ খেজুরের উৎপত্তির সাথে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর জীবনের বেশ কয়েকটি বিষয় সরাসরি জড়িত। সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ছিলেন একজন ইহুদির গোলাম। দাসত্বের কারণে তিনি বদর ওহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এর
প্রেক্ষিতে তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এর পরামর্শে তার মনিবের সাথে অর্থের বিনিময়ে দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার চুক্তি করেন। তার ইহুদি মালিক তাকে শর্ত দেয় যে তিনি যদি নির্দিষ্ট কয়েকদিনের মধ্যে নগদ 600 দিনার দিতে পারেন এবং 300 টি খেজুর গাছ রোপণ করতে পারেন এবং সেই খেজুর গাছে যদি খেজুর ধরে তবেই তিনি মুক্ত হতে পারবেন। এত কঠিন শর্ত দেওয়ার অর্থই ছিল হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু যেন মুক্ত হতে না পারেন। সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর পক্ষে 600 দিনার যোগাড় করা অনেক কঠিন ছিল। আর 600 দিনার যোগাড় করতে পারলেও খেজুর গাছ রোপণ করে তাতে ফল ধরে ফল
পাকানো অনেক সময়ের ব্যাপার। হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তার মুক্তির শর্তগুলো বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 600 দিনারের ব্যবস্থা করে দেন। এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে সাথে নিয়ে সেই ইহুদির কাছে যান। ইহুদি এককা খেজুর দিয়ে বলে এই খেজুর থেকে চারা উৎপন্ন করে ফল ফলাতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, ইহুদি খেজুর গুলোকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে যাতে চারা না গজায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম খেজুরের কাঁদি হাতে নিয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে গর্ত করতে বললেন। আর সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে বললেন পানি
আনতে। আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু গর্ত করলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে প্রতিটি গর্তে সেই পোড়া খেজুর রোপণ করে দিলেন। এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে বাগানের সকল গাছে পানি দেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং পানি দিতে দিতে বাগানের শেষ প্রান্তে না যাওয়া পর্যন্ত পিছে ফিরে তাকাতে নিষেধ করেন। সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু পেছনে না তাকিয়ে পানি দিতে থাকেন। বাগানের শেষ প্রান্তে যাওয়ার পর তিনি তাকিয়ে দেখলেন প্রতিটি গাছে খেজুর ধরেছে আর খেজুর গুলো পেকে কালো হয়ে আছে এই ঘটনার বর্ণনা নিয়ে সামান্য মতপার্থক্য রয়েছে অনেকে বলেছেন এই ঘটনাগুলো এভাবে ঘটেনি তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে
জানা যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর খেজুর গাছের চারা গুলো রোপন করেছিলেন এবং সেই চারার একটিও মরেনি সবগুলো থেকেই ফল হয়েছিল ছিল। এই বর্ণনার 600 দিনারের বদলে 40 উকিয়া স্বর্ণের কথাও বলা হয়েছে। সেই স্বর্ণও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামই সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে দিয়েছিলেন। দাসত্ব থেকে মুক্ত হবার পর সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু খন্দকের যুদ্ধসহ সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। খেজুর এমনিতেই অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার। তার উপর আজুয়া খেজুরের অনেক দিক থেকে বিশেষত্ব রয়েছে। হাদিস থেকে জানা যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে সাতটি আজুয়া খেজুর খাবে
সেদিন কোন বিষ ও জাদু তার ক্ষতি করতে পারবে না। আজুয়া খেজুর বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক ও ঔষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। আজুয়া খেজুরের বিভিন্ন উপকারী দিক রয়েছে। তার মধ্যে 10টি গুণ হল শরীরকে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার থেকে দূরে রাখে। কোলেস্টেরল থেকে মুক্তি দিয়ে হৃদ রোগের ঝুঁকি কমায়। হাড়, দাঁত, নখ, ত্বক ও চুল ভালো রাখতে সহায়তা করে। যকৃত ও পাকস্থলীর শক্তি বৃদ্ধি করে এবং হজম শক্তি বাড়ায়। ঠান্ডাজনিত সমস্যা এবং শ্বাসকষ্ট প্রতিরোধে কাজ করে। অন্তঃসত্তা নারীদের জরায়ুর মাংসপেশী দ্রুত সংকোচন সম্প্রসারণ ঘটিয়ে সন্তান জন্মদানে সহায়তা করে। প্রসব পরবর্তী কোষ্ঠ কাঠিণ্য ও রক্তক্ষরণ কমায়। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে
এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র স্থান মসজিদুল হারামের পাশেই রয়েছে মক্কার রয়েল হোটেল ক্লক টাওয়ার। আর এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘড়ি। সৌদি সরকারের মালিকানাধীন এই ভবনটি আব্রাজ আল বাইত টাওয়ার নামেও পরিচিত। 120 তলা এই বিল্ডিং টি বর্তমান বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়াও এই ভবনের 30 টির বেশি বিশ্ব রেকর্ড রয়েছে। 2002 সালে একটি অটোমান দুর্গ ভেঙে আব্রাজ আল বাইথ টাওয়ারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সাতটি বিশাল টাওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত এই ভবন নির্মাণ করতে প্রায় আট বছর সময় লাগে। বিল্ডিং এর সবচেয়ে বড় অংশটির উচ্চতা প্রায় 2000 ফুট। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘড়ির
টাওয়ার এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘড়ি। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা এবং চীনের সাংহাই টাওয়ারের পরেই এর অবস্থান। তবে নির্মাণ ব্যয়ের হিসাবে এটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি ভবন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভবন বুর্জ খলিফা নির্মাণ করতে খরচ হয়েছিল দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু আব্রাজ আল বাইদ টাওয়ার নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে 15 বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফ্লোর স্পেসের দিক থেকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভবন। এই বিল্ডিং এর ফ্লোরের আয়তন পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ ভ্যাটিকান সিটির চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন গুণ বড়। এই ভবনের নিচের চারতলা শপিং মল। এবং এখানে আছে 3000 কক্ষ বিশিষ্ট সাত তারকা মানের হোটেল, জাদুঘর এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তির টেলিস্কোপ সম্পন্ন
চন্দ্র পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এখানকার হোটেল রুম থেকে পবিত্র কাবা শরীফের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। এই টাওয়ারের বিভিন্ন জায়গায় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন লাউডস্পিকার বসানো হয়েছে। যার মাধ্যমে 7 কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আযানের ধ্বনি প্রচার করা যায়। মক্কা ঘড়ির দৈর্ঘ্য প্রায় 141 ফুট যা লন্ডনের বিগবে বেনের চেয়ে 35 গুণ বড়। মক্কা ঘড়ির ওজন 36 হাজার মেট্রিক টন। যা সমগ্র আইফেল টাওয়ারের ওজনের সাড়ে তিন গুণেরও বেশি। মক্কা ঘড়ির মিনিটের কাটার দৈর্ঘ্য সাড়ে 75 ফুট এবং ঘন্টার কাটার দৈর্ঘ্য সাড়ে 55 ফুট। দিনের বেলা ঘড়িটি থাকে সাদা ও কালো এবং রাতের বেলায় ঘড়ির রং হয়ে যায় সাদা ও সবুজ। মক্কা ঘড়ি মূলত
চারটি ঘড়ির সমন্বয়। ঘড়ির চারপাশ থেকেই দিনের বেলা 12 কিলোমিটার এবং রাতের বেলা 17 কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ঘড়িতে সময় দেখা যায়। 30 কিলোমিটার দূর থেকেও ঘড়িটি চোখে পড়ে। তবে অতদূর থেকে সময় বোঝা যায় না। মক্কা ঘড়িতে 9 কোটি 80 লক্ষ টুকরা 24 ক্যারেট সোনার টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। ঘড়ির উপরে লেখা আছে আল্লাহু আকবার। এই অংশটি আলোকিত করতে প্রায় 20 লক্ষ এলইডি বাতি ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই ঘড়ি গ্রিনিচ মানময় অনুযায়ী চলে না। এই ঘড়ি মক্কা মানসময়ে পরিচালিত হয়। 2008 সালে কাতারের রাজধানী দোহাই অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে মুসলিম পন্ডিত ও বিজ্ঞানীরা মত প্রকাশ করেন যে পৃথিবীর
মূল মধ্যরেখা পবিত্র মক্কার উপর দিয়ে প্রলম্বিত। ফলে মক্কা পৃথিবীর টাইম জোনের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা উদ্ভাবনীয় এই প্রকল্প নির্মাণ করাটা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। যেহেতু জায়গাটি পবিত্র মসজিদুল হারামের আঙ্গিনায় অবস্থিত, সেজন্য এর নির্মাণ প্রক্রিয়ায় কোনো অমুসলিম অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবে সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘড়ির এ একটি অংশ তৈরি করা হয়েছে। সুইস এবং জার্মান প্রকৌশলীরা ঘড়ির নকশা করেছে। এবং ঘড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে জার্মানিতে। ঘড়ির ক্যালিগ্রাফি নকশা করেছে তুরস্কের বিখ্যাত শিল্পীরা। এবং ভারতের দক্ষ কারিগরেরা স্বর্ণ দিয়ে সেসব ক্যালিগ্রাফিক প্লেট তৈরি করেছে। এখানকার জানালাগুলো তৈরি করা হয়েছে জার্মানিতে এবং জানালার কাছ বানানো হয়েছে বসনিয়ায়। ঘড়ির
উপরে 75 ফুট ব্যাসের একটি বাঁকা চাঁদ সংযুক্ত করা হয়েছে। নতুন চাঁদের মত এই অংশটি আসলে একটি নামাজের ঘর। এছাড়াও এখানে 21,000 উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বাতি সংযুক্ত করা হয়েছে। যা প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সময় সংকেত প্রদান করে। এছাড়া 10 কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আলোক প্রক্ষেপণের জন্য 16 ধরনের লাইট এখানে সংযুক্ত আছে। এই বিল্ডিং এ 10,000 মুসল্লি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি নামাজের ঘর এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পর্যবেক্ষণ ডেক আছে। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ঘরে বসে পবিত্র হজের অভিজ্ঞতা দিতে একাধিক ভার্চুয়াল রিয়ালিটি হজ্ সিমুলেটর নির্মাণ করা হচ্ছে। ভার্চুয়াল হজ কখনোই সশরীরে মক্কায় গিয়ে হজ পালন করার বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু যাদের
হজ পালন করার সামর্থ্য নেই তারাও এই পদ্ধতিতে পবিত্র হজ্ব করার সামান্য অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবে। 2019 সালে সারা বিশ্বের প্রায় 25 লক্ষ লোক পবিত্র হজ পালন করেছিল। কিন্তু মহামারীর কারণে 2020 সালে মাত্র এক হাজার মানুষ হজ পালন করার সুযোগ পেয়েছে| মহামারীর সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারায় 2021 সালে হজ্জে অংশগ্রহণ করতে পারবে মাত্র 60000 মানুষ আর্থিক এবং শারীরিক সামর্থ্যের অভাবে প্রতিবছর বিশ্বের বহু মুসলিম হজে যেতে পারে না বিভিন্ন অসুবিধার কারণে যাদের হজ করা হয়ে ওঠে না তারা যেন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে হজের অভিজ্ঞতা নিতে সেই চেষ্টাটাই করেছে পাকিস্তানের এক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান। লাভ বাইক ভিয়ার লিমিটেড
নামের এই কোম্পানি তৈরি করেছে বিশ্বের প্রথম রিয়ালিটি হজ ওমরা ট্রেনিং সিমুলেটর। এই সফটওয়্যার তৈরি করার মূল উদ্দেশ্য ছিল হজগামী মুসলিমদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা। লাব্বাইক ভিআর ব্যবহার করে পবিত্র মক্কা-মদিনার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ভার্চুয়ালি ঘুরে দেখা যাবে। সেই সাথে বিভিন্ন জায়গা চিনে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনাও থাকবে। পবিত্র হারাম শরীফের ছোটখাটো সকল বিস্তারিত সহ সম্পূর্ণ থ্রিডি মডেল নির্মাণ করা হয়েছে। এই অ্যাপ্লিকেশনের ভেতরে হজের যে কোন কাজ অনুকরণ করার সাথে সাথে সেই কাজের দোয়া স্ক্রিনের সামনে চলে আসবে। যেমন অ্যাপের ভেতর প্রথম কাবার সামনে গেলে প্রথমবার পবিত্র কাবা দর্শনের সময় যে দোয়া পাঠ করতে হয় সেই দোয়া পর্দায় ভেসে উঠবে।
তাওয়াফ থেকে শুরু করে শয়তানের উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপের মতো হজে গিয়ে যা যা করতে হয় সেই সমস্ত কাজের অনুশীলন করা যাবে খুব সহজে। হজে যে সমস্ত ভুলের কারণে সম্পূর্ণ হজই বাতিল হয়ে যেতে পারে লাব্বাইক ভিয়ারে সেসব বিষয়ে গুরুত্বের সাথে দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ভার্চুয়ালি হজের অভিজ্ঞতা দিতে মুসলিম থ্রিডি নামের আরেকটি শিক্ষামূলক ভিডিও গেমে আসছে। জার্মান ভিত্তিক সফটওয়্যার কোম্পানি বিজিটেক এই গেমটি নির্মাণ করেছে। এই গেমে প্রথমেই আপনার জাতি-বর্ণ উল্লেখ করে নিজের ত্রিমাত্রিক চরিত্র নির্মাণ করতে হবে। পুরুষদের জন্য চুল, দাড়ি, পোশাক এবং নারীদের জন্য বোরকা ও হিজাবের রং ইচ্ছামতো নির্ধারণ করা যাবে। পবিত্র মক্কা নগরীর ভার্চুয়াল জগতে
এই গেমটি খেলতে হবে। আপনি চাইলে মক্কা নগরীর প্রাচীন যুগের আবহও দেখতে পারবেন। হজের এই গেম খেলতে একজন ভার্চুয়াল অ্যাসিস্টেন্ট আপনাকে সার্বক্ষণিক সহায়তা করবে। তিনভাবে গেমটি খেলা যাবে। ফ্রি প্লে মোড, স্টোরি মোড এবং অনলাইন মোড। ফ্রি প্লে মোডে আপনি ইসলামের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানের ভার্চুয়াল জগতে ইচ্ছামতো বিচরণ করতে পারবেন। স্টোরি মোডে একজন শিক্ষকের অধীনে আপনি ইসলাম শিক্ষার ছাত্র হিসেবে গেম খেলতে পারবেন। সেই সাথে গেম খেলতে খেলতে ইসলামের অনেক বিষয় শিখতে পারবেন। এবং অনলাইন মোডে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অংশগ্রহণ করা অন্যান্য গেমারদের সাথে ভার্চুয়ালি হজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। ভারতের একটি বিখ্যাত মাদ্রাসা দারুল উলুম দেওবন্দ। এটি পৃথিবীর
সর্ববৃহৎ মাদ্রাসা। উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক জায়গায় এই মাদ্রাসা অবস্থিত। সালে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ইসলামী পন্ডিত এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দেওবন্দ কেন্দ্রিক ইসলামী পুনর্জাগরণ প্রাথমিকভাবে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানে শুরু হলেও, পরবর্তীতে এই ইসলামী আন্দোলন সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সৌদি আরবেও দেওবন্দী ধারার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতারা আকাবিরে সিত্তাহ নামে পরিচিত। আকাবিরে সিত সিত সিত সিত সিত সিত সিত সিত সিত সিত্তাহ অর্থ ছয় জন সম্মানিত ব্যক্তি। সেই ছয় জন সম্মানিত ব্যক্তি হলেন মোহাম্মদ কাশেম, মোহাম্মদ ইয়াকুব মোহাম্মদ আবেদ, রফিউদ্দিন, জুলফিকার আলী এবং ফজলুর রহমান। দেওবন্দ ছিল
মোহাম্মদ কাসেম নানুতুবির শ্বশুরালয়। সেখানে গেলে তিনি সাত্তা মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। হাজী মোহাম্মদ আবেদ হোসেন ছিলেন সাত্তা মসজিদের ইমাম। মাওলানা জুলফিকার আলী ও মাওলানা ফজলুর রহমান অত্র এলাকার বাসিন্দা ছিলেন| এসব ব্যক্তিবর্গ ব্রিটিশদের অধীনস্থ ভারতে ইসলামী শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে সঙ্কিত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার পর তারা একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। একদিন সাত্তা মসজিদের ইমাম হাজী আবেদ হোসেন ফজরের নামাজের পর নিজের পক্ষ থেকে তিন টাকা চাদা দিয়ে একটি ফান্ড গঠন করেন। সেই একই দিনে বেশ কয়েকজন বুজুর্গ মাওলানা এবং জ্ঞানুরাগী ব্যক্তির চাঁদা মিলিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে প্রায় তিনশ টাকা জমা হয়ে যায়। এভাবেই গণচাদার উপর ভিত্তি করে 1866
সালে ছোট্ট একটি ডালিম গাছের নিচে দেওবন্দ মাদ্রাসার গোড়াপত্তন হয়। দেওবন্দের সর্বপ্রথম ছাত্র এবং শিক্ষক উভয়ের নামই মাহমুদ। এই মাদ্রাসার প্রথম ছাত্র পরবর্তীতে শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে মাদ্রাসাটির বিশেষ কোন নাম নির্ধারণ করা হয়নি। তখন লোকমুখে মাদ্রাসাটি দেওবন্দ আরবি মাদ্রাসা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। 1878 সালে তৎকালীন মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা ইয়াকুব নানুতুবির প্রস্তাবে মাদ্রাসার নামকরণ করা হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার সময় উদ্দেশ্য ছিল পরাধীন ভারতে ধষে পড়া ইসলামী শিক্ষাকে পুনর্জীবিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করা। তৎকালীন প্রধান মাওলানা কাসেম নানুতুবি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় অনুদানের প্রাচীন ধারার পরিবর্তে গণচাদার
প্রতি অধিক গুরুত্ব দেন। তখন থেকে দেওবন্দ মাদ্রাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে আটটি মূলনীতি অনুসরণ করা হয়। এগুলোকে একসাথে বলা হয় উসুলে হাসতে গানা। দেওবন্দের আদলে পরিচালিত সকল মাদ্রাসায় এই নীতিগুলো কঠোরভাবে পালন করা হয়। মূলনীতিগুলোর সারমর্ম অনেকটা এরকম। পর্যাপ্ত গণচা আদায় আদায়ের বিষয়ে মাদ্রাসার কর্মকর্তা কর্মচারী এবং হিতাকাঙ্ক্ষীদের খেয়াল রাখতে হবে। মাদ্রাসার ছাত্রদের খাবার ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে এবং ক্রমাণ্যয়ে তা উন্নত করতে হবে। মাদ্রাসার উপদেষ্টাগণ মাদ্রাসার উন্নতি, অগ্রগতি এবং শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে নিজের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে অন্যের মতামতকে সহনশীলভাবে গ্রহণ করতে হবে। মাদ্রাসার সকল শিক্ষককে অবশ্যই সমমনা হতে হবে। দুনিয়াদার আলেমদের মতো নিজের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা ও অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন
করা যাবে না। মাদ্রাসার নির্ধারিত পাঠ্যসূচি অবশ্যই সমাপ্ত করতে হবে। মাদ্রাসার জন্য স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। স্থায়ী সম্পদ তৈরি হলে আল্লাহর গায়েবী সাহায্য বন্ধ হয়ে যাবে এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে বিদ্বেষ ও কলহ বিবাদ দেখা দিবে। মাদ্রাসার অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে জাগজমক পরিহার করতে হবে। সরকার ও আমির ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা এই প্রতিষ্ঠানের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এমন ব্যক্তিদের চাঁদা গ্রহণ করার চেষ্টা করতে হবে যারা চাঁদা দানের মাধ্যমে সুখ্যাতি লাভের আশা করবে না। জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত দেওবন্দ কখনো এক পয়সাও সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সাহায্য নেয়নি। শুধু তাই নয় অনেক রাজা-বাদশার অনুদানও ফিরিয়ে দেওয়া
হয়েছে। সে কারণে আজও এই প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি সাধারণ মানুষের দানের টাকায় পরিচালিত [মিউজিক] হয়। দারুল উলুম দেওবন্দে যে সিলেবাস পড়ানো হয়, সমগ্র বিশ্বজুড়ে তা দরসে নিজামী নামে পরিচিত। দরসে নিজামী প্রতিষ্ঠার আগে ইসলামী শিক্ষা কার্যক্রমে কোন সিলেবাস বা কারিকুলাম ছিল না। 1693 সালে মোল্লা নিজামুদ্দিন শাহলাভী ইসলামী শিক্ষাকে কিছুটা ঢেলে সাজান। তিনি দরসে নিজামী আকারে মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতি চালু করেন। তিনি ছিলেন একাধারে দ্বীনের সুদক্ষ আলেম, শিখা শাস্ত্রবিদ, দার্শনিক, ভাষ্যকার এবং একজন শিক্ষাবিদ। মোল্লা নিজামুদ্দিন তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় নিজামিয়াতে এই সিলেবাস প্রণয়ন করেছিলেন। তিনি গঠনমূলকভাবে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে প্রায় 11 টি বিষয়ের সমন্বিত সিলেবাস গ্রহণ করেন। ইতিহাসে এটাই দরসে নিজামী
নামে পরিচিত। দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পরে উক্ত দরসে নিজামী মাদ্রাসার সিলেবাস হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এখনো পর্যন্ত সেই দরসে নিজামী সামান্য পরিবর্তন করে দারুল উলুম দেওবন্দে পড়ানো হচ্ছে। এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে দারুল উলুম দেওবন্দের সুনাম ছড়াতে থাকে। তখন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ছাত্র এখানে আসতে থাকে এবং বিভিন্ন জায়গায় দেওবন্দের আদলে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। যারাই এখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে বেরিয়ে যেত তাদেরকে বলা হতো নিজের এলাকায় গিয়ে একই সিলেবাস অনুসরণ করে তোমরাও সেখানে পাঠশালা চালু করো। এই ধারার মাদ্রাসাগুলো কওমি মাদ্রাসা নামে পরিচিতি পায়। হাজী শরীয়তুল্লার ফরাজি আন্দোলন ও শাহ সৈয়দ আহমদের
তরিকা মোহাম্মদীয়া আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা অঞ্চলে দেওবন্দের অনুরূপ কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। দারুল উলুম দেওবন্দে ভারতের তো বটেই বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মালয়েশিয়া, ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বহু ছাত্র শিক্ষা গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ মাওলানা ভাষানী, সদ্যপ্রায়াত প্রখ্যাত আলেম আহমেদ শফীর মতো বহু ইসলামী পন্ডিত দারুল উলুম দেওবন্দেই পড়াশোনা করেছেন। এছাড়া ভারত পাকিস্তান মালয়েশিয়ার বহু রাজনীতিবিদ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এই মাদ্রাসার ছাত্র। এখানকার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা মনে করেন দারুল উলুম দেওবন্দে যে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষার গভীরতা বা আধ্যাত্মিকতার পাঠ দেওয়া হয় সারা বিশ্বে অন্য কোথাও তা পাওয়া যাবে [মিউজিক] না। দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পেছনে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি
সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতাও শামিল ছিল। সেখানেই এই মাদ্রাসার বিশেষত্ব। দারুল উলুম দেওবন্দের পন্ডিতদের একটি বড় অংশ ভারত ভাগ করে দুই রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছেন। হুসাইন আহমেদ মাদানী পাকিস্তান ধারণার বিরোধিতাকারী পন্ডিতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। সে সময় তিনি মাদ্রাসার শাইখুল হাদিস হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং আলেমদের সংগঠন জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের নেতৃত্ব দেন। অপরদিকে দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম সাব্বির আহমেদ উসমানী পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি মাদ্রাসার দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। দেওবন্দ মাদ্রাসা বর্তমান সময়েও ইসলামী বিশ্বের জনমত গঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই মাদ্রাসা ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার। 2008 সালে দারুল উলুম দেওবন্দ সন্ত্রাস বিরোধী ও বিশ্ব
শান্তি সম্মেলন নামে সর্বভারতীয় সন্ত্রাস বিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করে। এই সম্মেলন থেকে দারুল উলুম দেওবন্দের ব্যানারে এক লক্ষাধিক আলেমের উপস্থিতিতে সহিংসতাকে অনইসলামিক ঘোষণা করে সন্ত্রাসবাদের উপর ফতোয়া জারি করা হয়। দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়ায় বলা হয় ইসলাম সকল প্রকারের অনাজ্য সহিংসতা, শান্তির লঙ্ঘন, রক্তপাত, হত্যা ও লুন্ঠনকে প্রত্যাখ্যান করে। ইসলামের মত ধর্মের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল সকল প্রকার সন্ত্রাসবাদ মুছে ফেলার জন্য। ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া এটিই প্রথম ফতোয়া। পরবর্তীতে দেওবন্দের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিশ্বের নানা সংগঠন ও ইসলামী পন্ডিতগণ প্রকাশ্যে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করেছেন। মিশরের কায়রো শহরে
অবস্থিত একটি বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়। আল আজহার বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। 972 সালে ফাতেমীয় ও খলিফা আল মুইজের আদেশে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক নাম জামিয়াতুল আজহার। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারও পৃথিবীর ইতিহাসে বেশ পুরনো। 1005 সালে সমৃদ্ধ এই লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কায়রোর আল আজহার মসজিদকে কেন্দ্র করে আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ধর্ম এবং ইসলামী সংস্কৃতির বিস্তার ঘটানো। পরবর্তীতে শুধু ইসলামী জ্ঞানই নয় ধর্মনিরপেক্ষ বহু বিষয়ও আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠার আগে অতি প্রাচীনকাল থেকেই এখানে জ্ঞানের চর্চা হয়ে আসছে।
প্রথমদিকে আল আযহার মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা গবেষণা কার্যক্রম ছিল অনেকটা অনানুষ্ঠানিক। তখন এখানকার পাঠদানের কোন ধরা বাধা পাঠ্যক্রম বা সিলেবাস ছিল না। শিক্ষার্থীদের ভর্তি হবার কোন নিয়ম ছিল না। তাই কোন ডিগ্রীও প্রদান করা হতো না। তৎকালীন ফাতেমী খলিফারা কায়রোর আল আজহার মসজিদে পন্ডিত ও ফকিহীগণকে গবেষণা করতে উৎসাহিত করতেন। পরবর্তীতে একে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। সে কারণেই আল আজহার পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত। এই বিশ্ববিদ্যালয় মিশরের তো বটেই সমগ্র পৃথিবীর মধ্যেই অন্যতম প্রাচীন ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়। জামিয়াতুল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কুরআন এবং ইসলামী আইন শিক্ষা গ্রহণ করেন। বহু প্রাচীনকাল থেকেই কুরআন ফিকাহ ছাড়াও ব্যাকরণ যুক্তিবিদ্যা, অলংকার শাস্ত্র
এবং চান্দ্রকলার মত বহু বিষয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। অলংকার শাস্ত্র পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন মননশীল শিল্প। অলংকার শাস্ত্রে ব্যাকরণ ও যুক্তির মাধ্যমে পাঠক ও শ্রোতাদেরকে মহাবিষ্ট করার শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রাচীনকালের বহু বিখ্যাত লেখক এবং সুবক্তারা এই শাস্ত্র অধ্যয়নের কল্যাণেই বিভিন্ন সময়ে মানব সমাজকে শিক্ষাদান, প্রভাবিত এবং অনুপ্রাণিত করেছেন। এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বিষয় হল চান্দ্রকলা। এই বিভাগে মূলত চাঁদের অবস্থান ও চাঁদের বিভিন্ন দশা গবেষণা সংক্রান্ত বিজ্ঞান অধ্যয়ন করা হয়। এছাড়া আরবি সাহিত্য এবং ইসলামিক স্টাডিজ অধ্যয়নের জন্য আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। 1961 সালের দিকে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মত শিক্ষা ব্যবস্থা
প্রবর্তন করে। তখন থেকে ইসলামী বিষয়ের পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো আধুনিক বিষয়সমূহ চালু করা হয়। পরবর্তীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আরো বহু শাখা আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়টি ইনস্টিটিউট এবং 359 টি একাডেমিক বিভাগ রয়েছে। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 1798 সালে ফরাসিদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুতান শুরু হয়েছিল। তাই ফ্রান্সের শাসকেরা বোমা মেরে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় উড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর সাময়িক সময়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ ছিল। গভীর জ্ঞানের চর্চার কারণে আল আজহার বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। ইসলামিক এবং আধুনিক শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বসভ্যতায় আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু অবদান রয়েছে। ইসলামী
জ্ঞান সাধনার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান মদিনা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়। এটি সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। 1961 সালে সৌদি সরকারের একটি রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে মদিনা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অফ শরীয়াতে ইসলামিক আইন বিষয়ে পাঠদানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বর্তমানে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি পৃথক স্কুলের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কুরআন, হাদিস, শরীয়া, দাওয়া এবং আরবি ভাষা শিক্ষা বিষয়ক পড়াশোনা। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট এই তিন শ্রেণীতে শিক্ষাদান ও ডিগ্রি প্রদান করা হয়। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুমাত্র মুসলিম পুরুষ শিক্ষার্থীরাই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের ছয়
থেকে সাত হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়টিতে লেখাপড়া করেন। যেকোনো মুসলিম ব্যক্তি স্কলারশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবেন। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় এর সকল শিক্ষার্থীর আনুষঙ্গিক ব্যয়ভার বহন করে। আরব বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়টির রেঙ্কিং 80 থেকে 90 এর মধ্যে ওঠানামা করে এবং সমগ্র বিশ্বে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং 800 এর কাছাকাছি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে দেড় লক্ষেরও বেশি বই আছে। এছাড়াও এই লাইব্রেরিতে বহু প্রাচীন পান্ডুলিপি রয়েছে। যা ডিজিটালি কনভার্ট করা হচ্ছে। প্রতিদিন আসর থেকে ইশার নামাজের সময় ছাত্রদের মসজিদে নববীতে যাওয়া আসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বাস সার্ভিস প্রদান করা হয়। ইসলামী বিশ্বে অবদান রাখা অনেক পন্ডিত ব্যক্তি মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেন কানাডার লেখক ও ইসলামী চিন্তাবিদ বিলাল ফিলিপস এবং জিম্বাবুয়ের প্রধান মুফতি, শিক্ষাবিদ ও বক্তা মুফতি মেনক। [মিউজিক] মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াহাবী সালাফিবাদী ধর্মতত্ত্ব প্রচার করে। সালাফ শব্দের শাব্দিক অর্থ পূর্বপুরুষ। আর ব্যবহারিক অর্থে ইসলামের প্রথম যুগের মানুষগণ অর্থাৎ সাহাবী তাবেঈ ও তাবে তাবেঈগণ। যাদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন তারা হলেন উম্মতদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ উম্মত। আর সালাফদের অনুসারীগণই হল সালাফি। ইসলামের প্রথম তিন যুগের মানুষ ইসলামকে যেভাবে বুঝতেন আর পালন করতেন হুবহু তাদের মত করে ইসলাম বোঝা আর পালন করাকে সালাফিবাদ বলা হয় অন্যদিকে ওয়াহাবী আন্দোলন হল বিশুদ্ধবাদী ইসলামী পুনর্জাগরণ সালাফী পন্ডিত মোহাম্মদ
ইবনে আব্দুল ওয়াহাব ইবনে তাইমিয়া এবং আহমদ ইবনে হাম্বলের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওয়াহাবী আন্দোলন শুরু করেন। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা ইসলামের মূলধারা থেকে বিচ্যুতদেরকে কোরআন ও হাদিসের বর্ণিত পথে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় সালাফি ওয়াহাবী মতাদর্শ ধারণ করে এবং বিশ্বজুড়ে সালাফীবাদী পন্ডিত ও প্রচারকদের পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পবিত্র স্থান মসজিদে নববী। মসজিদে আল হারামের পরেই মসজিদে নববীর স্থান। মসজিদে নববী শুধু উপাসনার জায়গা নয় এটি একাধারে সম্মেলন কেন্দ্র বিচারালয় এবং ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিবছর হজের আগে বা পরে সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলিম এই মসজিদে ইবাদত করতে আসেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা
ছেড়ে মদিনায় আসার পর মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম নিজে এই মসজিদ নির্মাণের জন্য শারীরিক শ্রম দিয়েছেন সর্বপ্রথম নির্মিত মসজিদে নববীর দৈর্ঘ্য ছিল 117 ফুট এবং প্রস্থ ছিল 100 ফুট তখন মসজিদের খুঁটি নির্মাণ করা হয়েছিল খেজুর গাছের কান্ড দিয়ে এর ছাদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল খেজুর গাছের পাতা এবং কাদার আস্তরণ তখন মসজিদের মেঝেতে ছিল শুধু মরুভূমির বালি খাইবারের যুদ্ধের পরে মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে মসজিদের সম্প্রসারণ করা হয়। তখন মসজিদে নববী সবদিক থেকে 155 ফুট করে সীমানা বৃদ্ধি পায়। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর শাসনা আমল পর্যন্ত মসজিদের সেই আকার অপরিবর্তিত
ছিল। এরপর দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময়ে মসজিদের সীমানা বৃদ্ধি করেন এবং মসজিদের মেঝেতে পাথর বসানো হয়। তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর সময় নতুন করে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি খেজুর গাছের কান্ডের বদলে লোহা ও পাথর দিয়ে মসজিদের খুঁটি স্থাপন করেন এবং ছাদ নির্মাণ করতে সেগুন কাঠ ব্যবহার করেন। এরপর উমাইয়া, আব্বাসীয়, উসমানীয় এবং সর্বশেষ সৌদি রাজ পরিবারের শাসনামলে বহু ধাপে মসজিদের সীমানা সম্প্রসারণ এবং মসজিদের কাঠামোর উন্নয়ন করা হয়েছে। মসজিদে নববীর একটি প্রতীকী অংশ হল সবুজ গম্বুজ। এই জায়গাটি ছিল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাসগৃহ। বর্তমানে মসজিদের দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত এই গম্বুজের নিচে রয়েছে
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা বা সমাধি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের সমাধির পাশে তার ঘনিষ্ঠ দুই সহচর হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর সমাধিও রয়েছে এবং তাদের পাশে আরো একটি সমাধির জায়গা হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্য খালি রাখা হয়েছে। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে জীবিত অবস্থায় আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি আবারো পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং তার দায়িত্ব সম্পন্ন করে মারা যাবার পর হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজার পাশে থাকা খালি জায়গায় সমাহিত করা হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা জিয়ারত করার জন্য যেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে
হয় তার নাম বাবুস সালাম এবং জিয়ারত শেষে বাবুল বাকী নামক দরজা দিয়ে বের হতে হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এর রওজার দরজা কখনো খোলা হয় না। কারণ অনেকেই সেখানে গিয়ে সিজদা করতে পারে। ইসলামে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা জায়েজ নেই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের রওজা থেকে মসজিদে নববীর মিম্বার পর্যন্ত বিস্তৃত জায়গাটিকে বলা হয় রিয়াদুল জান্না। যার অর্থ জান্নাতের বাগান। এই জায়গার মধ্যে নামাজ আদায় করা জান্নাতের বাগানে নামাজ আদায় করার শামিল। রিয়াদুল জান্না মধ্যে থেকে কোন দোয়া করা হলে তা অবশ্যই আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়। হজের সময় আগত সকল মুসল্লিরা এই জায়গায় নামাজ আদায় করতে চায়।
কিন্তু এই জায়গায় নামাজ আদায় করা খুব সহজ নয়। কারণ এখানে জায়গা পাওয়ার জন্য মুসল্লিদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যায়। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় মদিনার যতটুকু অংশ জুড়ে মানববসতি ছিল তার অনেকাংশই এখন মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এর প্রমাণ হিসেবে বলা যায় অতীতে মদিনা জনবসতির একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল জান্নাতুল বাকী কবরস্থান। আর বর্তমানে জান্নাতুল বাকী মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণের পাশেই অবস্থিত। জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এর স্ত্রী আত্মীয়স্বজনসহ বেশ কয়েক হাজার সাহাবীর কবর রয়েছে বর্তমান সময়ে মসজিদে নববী এর প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের আয়তনের চেয়ে 100 গুণেরও বড় মসজিদে নববীতে প্রায় 6 লক্ষ লোক একসাথে নামাজ
আদায় করতে পারেন। তবে হজের মৌসুমে প্রায় 10 লক্ষেরও বেশি লোক এই মসজিদ প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে পারে। অতীতে এই মসজিদ ছিল ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র। মসজিদে সবসময় একদল সাহাবী বসবাস করত তাদেরকে বলা হতো আসহাবে সুফফা তারা ইসলামের জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন পরবর্তীতে তাদের কাছ থেকেই বহু সংখ্যক হাদিস সংগ্রহ করা [মিউজিক] হয়েছে ইসলামের অন্যতম গুরুত্ববাহী একটি জায়গা আল আকসা মসজিদ যা মসজিদুল আকসা নামেও পরিচিত। পবিত্রতার দিক থেকে মক্কা ও মদিনার পরেই মসজিদুল আকসার অবস্থান। কাবা শরীফের পূর্বে এই মসজিদ মুসলমানদের প্রথম কিবলা ছিল। আল কুরআনে উল্লেখিত পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে মসজিদুল আকসা অন্যতম। বর্তমানে মসজিদটি মুসলমানদের
অধিকারে থাকলেও ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চল দখল করে রেখেছে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল। ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণের চল্লিশ বছর পর হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন পরবর্তীতে হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের নির্দেশে হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন পূর্বে এর নাম ছিল বায়তুল মাকদিস। পরবর্তীতে কুরআন শরীফে এর নামকরণ করা হয় আল মাসজিদুল আকসা। মসজিদুল আকসা অর্থ দূরের মসজিদ। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার মসজিদুল হারাম মদিনার মসজিদে নববী এবং মসজিদে আকসার উদ্দেশ্যে সফরকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন। হাদিসে আছে হিজরতের এক বছর আগে 27 রজব মিরাজের রাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে বায়তুল
আকসায় উপনীত হন। এরপর বোরাককে বাইরে বেঁধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম মসজিদে আকসায় প্রবেশ করেন এবং সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। মসজিদুল আকসা কোন একক মসজিদ নয়। মসজিদে কিবলি, মসজিদে মারওয়ানী, মসজিদুল করিম, মসজিদুল বোরাক এবং তুব্বাতে সাকরাম। এই পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন মসজিদের সমন্বয়ে মসজিদুল আকসা গঠিত। এর ঠিক মাঝখানে রয়েছে গোলাকৃতির ডোম অফ দি রক বা গম্বুজে সাখরা। সাখরা অর্থ পাথর। এটি বিশ্বের বুকে থাকা তিনটি বরকতময় পাথরের মধ্যে একটি। অপর দুটি বরকতময় পাথর হল পবিত্র মক্কার হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিম| 27 একর ভূমির উপর অবস্থিত এই মসজিদে একসাথে প্রায় 5000 মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে মসজিদুল
আকসায় বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে 746 সালে একটি ভূমিকম্পে মসজিদুল আকসা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় 754 সালে আব্বাসী ও খলিফা আল মনসুর পুনরায় মসজিদ নির্মাণ করেন। 780 সালে এটি আবারো সংস্কার করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে 1033 সালে মসজিদটি আরেক ভূমিকম্পে আবার ধ্বংস হয়ে যায়। তার দুবছর পর ফাতেমীয় খলিফা আলিয়াস জাহির আবারো সেই জায়গায় মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। বর্তমানে মসজিদুল আকসা খলিফা আলীর বানানো জায়গার উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ধাপের সংস্কার কাজের সময় মসজিদের মিম্বার ও মিনার সহ বেশ কিছু অংশ সংযোজন করা হয়। মসজিদুল আকসার কর্তৃত্ব বহুবার হাত বদল হয়েছে। 638 সালে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা
আনহুর সময়ে জেরুজালেম মুসলমানদের অধিকারে আসে। তার 450 বছর পর 1096 সালে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চল দখল করে নেয়। সে সময় মসজিদুল আকসাকে তারা একটি গির্জায় পরিণত করে। তখন 88 বছর খ্রিস্টানদের দখলে থাকার পর 1187 সালে মুসলিম বীর সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী পুনরায় মসজিদুল আকসা সহ জেরুজালেম শহরকে মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। 1967 সালে ছয় দিনের যুদ্ধ নামে খ্যাত আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইলের বিপক্ষে মিশর, জর্ডান ও সিরিয়া লড়াই করে। মুসলমানরা এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মসজিদুল আকসা এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারায়। তখন থেকে ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণ আজও তাদের আবাসভূমি এবং মসজিদুল আকসা উদ্ধারের জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। 2016
সালের 13 ই অক্টোবর জাতিসংঘর অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো ভোট গ্রহণের মাধ্যমে ঘোষণা করে যে মসজিদুল আকসা কেবলই মুসলমানদের অধিকারে থাকবে এবং এখানে ইসরাইলের কোনো হস্তক্ষেপ চলবে না। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা তো দূরের কথা বরং অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল ফিলিস্তিনের নিরীহ জনগণের উপর সহিংসতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসলামী স্থাপত্যের এক ধ্রুপদী নিদর্শন কুর্তুবা মসজিদ যা করডোভা মসজিদ বা করডোভা ক্যাথেড্রাল মসজিদ হিসেবেও পরিচিত। মসজিদটি স্পেনের কর্ডোভা প্রদেশে অবস্থিত। তৎকালীন সময়ে স্পেনে মুসলিম শাসনের অধীনে এই বিখ্যাত মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল। এই মসজিদের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। 1984 সালে ঐতিহাসিক এই মসজিদটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট
হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অতীতে মুসলমানদের দ্বারা নির্মিত হয়ে 500 বছর মুসলমানদের মালিকানায় থাকলেও বর্তমানে এই মসজিদে মুসলমানদের নামাজ আদায় করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কারণ স্পেনের সরকার মসজিদটিকে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের হাতে সমর্পণ করেছে। অতীতে স্পেন ও পর্তুগাল অঞ্চল আল আন্দালুস নামে পরিচিত ছিল। উমাইয়া যুবরাজ প্রথম আব্দুর রহমান আন্দালুসে করডোভা আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। 785 সালে আব্দুর রহমান তার খেলাফতের কেন্দ্র হিসেবে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। সুলতান নিজেও প্রতিদিন এক ঘন্টা করে মসজিদ নির্মাণের কাজে শ্রম দিতেন। 788 সালে খলিফা আব্দুর রহমান মারা যাবার সময় মসজিদটির নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে ছিল। সেই সময়ের তুলনায় মসজিদটি খুব দ্রুত নির্মাণ করা হয়েছিল। যা
ছিল তৎকালীন সময়ের নির্মাণ শিল্পের বিস্ময়। আন্দালুসে মুসলিম শাসনের সময়ে দিনে দিনে মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কর্ণডোভা মসজিদ তিনবার ব্যাপক আকারে সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। প্রথম আব্দুর রহমানের মৃত্যুর পর তার ছেলে হিশাম খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন| এবং তিনিও মসজিদের সৌন্দর্য বাড়াতে অবদান রাখেন। 793 সালে খলিফা হিশাম মসজিদটির প্রাথমিক কাজ শেষ করেন। প্রাথমিক কাজ শেষে কুরতুবা মসজিদের দৈর্ঘ্য হয় 600 ফুট এবং প্রস্থ 350 ফুট। খলিফা হিশামের পর উমাইয়াদের সব শাসকই মসজিদের উন্নয়ন অব্যাহত রাখেন। দশম শতাব্দীতে খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমান কুরতুবা মসজিদের পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন তখন মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় 1 লক্ষ 10400 ফুট। 50 দরজার এই বিশাল
স্থাপনায় রয়েছে 1293 টি স্তম্ভ। অনিন্দ সুন্দর এই মসজিদের থামগুলো নির্মিত হয়েছে মার্বেল, গ্রানাইট, জেস্পার ও অনিক্স পাথর দিয়ে। সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবার পর মসজিদটি বিশ্বের অন্যতম সেরা স্থাপত্য শৈলীর মর্যাদা লাভ করে। একজন সিরিয়ান স্থপতি মসজিদটির নকশা করেছিলেন। পরবর্তীতে বহু মসজিদের নকশার জন্য কর্ণডোভা মসজিদকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। দশম শতাব্দীতে এটি ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ মসজিদ। তখন মুসল্লি ধারণ ক্ষমতার দিক থেকে মক্কার মসজিদুল হারামের পরেই ছিল কর্ডোভা মসজিদের অবস্থান। [মিউজিক] বহু ধাপে সংস্কার এবং সম্প্রসারণের সময় খলিফা দ্বিতীয় আল হাকাম মসজিদের অন্যতম আকর্ষণীয় একটি অংশ যুক্ত করেন। তা হলো এই মসজিদের চোখ ধাঁধানো মিহরাব। এই
মিহরাবটি সাধারণ মসজিদের মিহরাব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এর ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হবে এটি যেন পরজন্মের প্রবেশদ্বার। মসজিদের মিহরাবের উপরে রয়েছে অসাধারণ এক গম্বুজ। অতীতে মেহরাবের কাছে একটি উঁচু মিম্বারও ছিল। বিভিন্ন রঙের 36 হাজার কাঠের খন্ড এবং মূল্যবান হাতির দাঁত দিয়ে মিম্বারটি তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়াও মিম্বারের উপর ছিল নানা রকমের মূল্যবান পাথরের কারো কাজ। মিম্বারটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ সাত বছর। এর পাশেই তৈরি করা হয়েছিল 108 ফুট উঁচু মিনার। যাতে ওঠানামার জন্য 107 টি ধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ি ছিল। মসজিদের মধ্যে ছোট বড় 10 হাজার ঝাড় বাতি জ্বালানো হতো। তার মধ্যে সর্ববৃহৎ তিনটি ঝাড় বাতি ছিল রুপার
এবং বাকিগুলো ছিল পিতলের তৈরি। বড় বড় ঝাড়ের মধ্যে 1480 টি প্রদীপ জ্বালানো হতো। শুধু তিনটি রুপার ঝাড়েই 36 এর তেল পোড়ানো হতো। সে সময় মসজিদের তদারুকীতে 300 জন খাদেম নিয়োজিত ছিলেন। কুরতুবা মসজিদ ছিল তৎকালীন মুসলিম শাসনের সরী আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এখানে গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা ও জ্ঞান চর্চা করা হতো। বহু বিখ্যাত ইসলামী পন্ডিত এই মসজিদে বসে কুরআন ও হাদিসের পাঠ শিক্ষা দিতেন। বহু ইউরোপীয় পন্ডিতও এখান থেকে তাদের উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেছেন। বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তফসীর আল কুরতুবীর সাথে এই মসজিদের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আল্লামা কুরতুবী রহমতুল্লাহ আলাইহি এই মসজিদেই তার রচিত তাফসীরে কুরতুবীর পাঠ দিতেন।
মসজিদে বসেই ইলমে তাসাউফের শিক্ষা দিতেন শাইখুল আকবর, সুফি ইমাম ইবনে আরাবী। বাকি ইবনে মাখলাদ, হযরত ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া আন্দালুসির মত ব্যক্তিত্বও এই মসজিদে ইলমে দ্বীনের পাঠ দান করতেন। হযরত ইবনে হাজাম জাহেরী ইলমে ফিকাহের মাসলা মাসায়েল নিয়ে এখানে আলোচনা করতেন। এছাড়াও বহু মুসলিম পন্ডিত করডোভা মসজিদে তাদের জ্ঞানচর্চা এবং পাঠ দান করেছেন। মুসলিমরা প্রায় 500 বছর এই অঞ্চলে রাজত্ব করার পর আন্দালুসে মুসলিম সাম্রাজ্য হুমকির মুখে পড়ে। 1236 সালে রাজা তৃতীয় ফার্ডিনান্দ ও রানী ইসাবেলা নির্বিচারে মুসলিমদের হত্যা করে। তখন খ্রিস্টানরা মুসলিম অধিকৃত অঞ্চল দখল করে নেয়। খ্রিস্টানরা করডোভা মসজিদে আসার পর এর নির্মাণ শৈলী এবং কারুকার্য দেখে অত্যন্ত
বিশ্বয় প্রকাশ করে। তারা মনে করে অসাধারণ এই স্থাপনা ভেঙে ফেলা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই খ্রিস্টানরা কর্ডোভা মসজিদকে গির্জায় পরিণত করে। তার প্রায় 200 বছর পরে 1523 সালে খ্রিস্টানরা একটি অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মসজিদের কেন্দ্রীয় অংশ ভেঙে একটি নতুন ক্যাথেড্রাল বা গির্জা তৈরির পরিকল্পনা করে। এই অংশটি নির্মাণ করতে আরো 300 বছর সময় লাগে। মসজিদের ভেতরে ক্যাথেড্রাল তৈরি হবার কারণে এই স্থাপনাটি ক্যাথেড্রাল মস্ক অফ করডোভা বা করডোভার ক্যাথেড্রাল মসজিদ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পায়। একসময় ইসলামী শাসনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হলেও বর্তমানে এই মসজিদে নামাজ আদায় করা সম্পূর্ণ নিষেধ। মসজিদটি স্থাপনের পর থেকে একটা না 500
বছর মুসলিমরা এখানে নামাজ আদায় করেছে 500 বছরের প্রতিদিন দিনে পাঁচবার মসজিদের মিনার থেকে আযান দেওয়া হয়েছে আর বর্তমানে সেই মিনারে লাগানো হয়েছে গির্জার ঘন্টা মুসলিমদের বিতাড়িত করার পর থেকে করডোভা মসজিদে কোন আযান ও নামাজ হয়নি এখানে সেজদা দেওয়া তো দূরের কথা মুসলিমরা এখানে রুকুও করতে পারে না মুসলিমদের ইবাদত করা থেকে বঞ্চিত করতে মসজিদের বিভিন্ন বিভিন্ন জায়গায় সিকিউরিটি ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং বিশেষ সিকিউরিটি ফোর্স বিষয়টি সার্বক্ষণিক নজরদারী করে। করডোভা মসজিদে নামাজ আদায় সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে পেরেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত কবি, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ আল্লামা ইকবাল 1933 সালে স্পেন
সফরকালে এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। তিনি মসজিদে প্রবেশ করেই মসজিদের দরজা বন্ধ করে উচ্চস্বরে আযান দেন। দীর্ঘ সাত বছর পর কর্ণদোভা মসজিদে এটিই ছিল প্রথম আজান। আযানের পর জায়নামাজ বিছিয়ে আল্লামা ইকবাল দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। তার নামাজের মধ্যে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, তিনি বেহুশ হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি কাঁদতে কাঁদতে কবিতার মত করে মোনাজাত করেন। ঐতিহাসিক কর্ডোভা মসজিদে নামাজ পড়ার আবেগকে তিনি সাতটি কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। এরপর 1974 সালে সাদ্দাম হোসেন ইরাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্পেন সফর করেন। সেই সফরে তিনি স্প্যানিশদের আতিথীয়তায় করডোভা মসজিদ ভ্রমণ করেন। এবং সেই ভ্রমণের এক পর্যায়ে সাদ্দাম হোসেন
কর্ডোভা মসজিদের মেহরাবে নামাজ আদায় করেন। স্পেন সফরে আসা আরব বিশ্বের নেতা আমির এবং রাজপুত্ররা কয়েকবার এখানে নামাজ আদায় করার সুযোগ পেয়েছেন। 2000 সালের পর থেকে সমগ্র স্পেনের মুসলিমরা এই মসজিদে নামাজ আদায় করার জন্য অনেক তদবির করেছে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। মুসলিমদের দাবির মুখে মসজিদের মালিকানা নির্ধারণের জন্য 2015 সালের পরে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু সালে কর্ণোভার মেয়র এই মসজিদের মালিকানা নির্ধারণ সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের কাজ বন্ধ করে দেয় এবং সে বলে ভবিষ্যতে এই কমিশনের কাজ পুনরায় চালু করারও কোন সম্ভাবনা নেই। তুরস্কের হায়াসোফিয়াকে ন্যায়সঙ্গতভাবে মসজিদে রূপান্তর করার পরও পশ্চিমা ভন্ডরা বহু বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
অথচ মুসলমানদের মালিকানার এমন এক ঐতিহাসিক নিদর্শনকে তারা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। কিন্তু দ্বিমুখী পশ্চিমা প্রতারকরা এ বিষয়ে কোনো আলোচনাও করতে চায় না। শুধু স্পেন নয় গ্রিস, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গিস সহ বলকান অঞ্চলে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর সেখানকার বহু মসজিদকে জোরপূর্বক গির্জায় রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং অনেক মসজিদ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। অতীতে ইসলাম ধর্ম এবং ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির কারণেই স্পেন উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পেরেছিল। বিপরীতে সেই ইসলামকেই অত্যন্ত ঘৃন্নভাবে স্পেন থেকে অপসারণ করা হয়েছে। যাদের কারণে তারা উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পেরেছে তাদের প্রতি নূন্যতম কৃতজ্ঞতা বোধটুকুও নেই। বরং ইসলামকে স্পেনের মাটি থেকে মুছে ফেলতে সকল
রকমের অপচেষ্টা করা হয়েছে। আন্দালুসে মুসলিম শাসন শুধু স্পেন বা পর্তুগাল নয় বরং সমগ্র ইউরোপে উন্নত সভ্যতা গড়ে তুলতে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। 1000 সালের দিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহর ছিল কর্ডোভা। তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহানগর কর্ডোভায় প্রায় 2 লক্ষ বাড়ি, 6000 মসজিদ, 900 টি পাবলিক বাদ, 50 টি হাসপাতাল এবং বিশাল বিশাল বাজার ছিল। জমকালো শহর দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, প্রশস্ত রাস্তা, সড়ক বাতি, মনোরম উদ্যান, কৃত্রিম ঝরণা ইত্যাদি বিষয়ের সাথে পশ্চিমাদের পরিচয় করিয়েছিল মুসলিমরা। শুধু তাই নয়, মুসলিমদের স্থাপিত উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, গ্রন্থাগার এবং সাংস্কৃতিক অবকাঠামো থেকে স্প্যানিশরা ব্যাপক উপকৃত হয়। বস্তুত কর্ডোভাকে কেন্দ্র করে সমগ্র আন্দালুস ছিল তৎকালীন বিশ্বের আন্তর্জাতিক
জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্র। তখন ইউরোপ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলেই ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। কিন্তু কর্ডোভা ছিল এক আলোকজ্জল শহর। সে কারণে কর্ডোভাকে বলা হতো ইউরোপের বাতিঘর। দিল্লি জামে মসজিদ দিল্লিতে অবস্থিত ভারতের অন্যতম বৃহৎ একটি মসজিদ। মুঘল সম্রাট শাহজাহান 1644 সাল থেকে 1656 সালের মধ্যে মুঘল রাজধানী শাহজাহানাবাদে এই মসজিদটি তৈরি করেন। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের আগ পর্যন্ত এটি ছিল সাম্রাজ্যের প্রধান মসজিদ। মসজিদটি ভারতের ইসলামিক শক্তি এবং ঔপনিবেশিক শাসনে প্রবেশের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্রিটিশ শাসনের সময়ে জামে মসজিদ রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পুরান দিল্লিতে থাকা মসজিদটি দিল্লির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই মসজিদের দুইটি নাম রয়েছে। প্রথম নামটি
হল মসজিদই জাহান্নামা। যার অর্থ পৃথিবীর প্রতিবিম্ব মসজিদ। এই নামটি দিয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান। সাধারণ মানুষের দেয়া আরেকটি নাম হল জামে মসজিদ। অনেকে একে জামা মসজিদ নামেও ডাকে। মসজিদটিতে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় বলে একে জামে মসজিদ বা জামা মসজিদ বলা হয়। মুঘল সম্রাট শাহজাহান শাহজাহানাবাদের সবচেয়ে উঁচু স্থানে মসজিদটি নির্মাণ করেন। এমনকি শাহজাহান মসজিদ নির্মাণের জন্য তার প্রাসাদের চেয়েও উঁচু জায়গা বাছাই করেন। মসজিদটির নকশা করেছিলেন স্থপতি ওস্তাদ খলিল। তৎকালীন সময়ে মসজিদকে অনেকটা দুর্গের মত করে নির্মাণ করার প্রবণতা ছিল। এই মসজিদের নকশায়ও তা লক্ষ্য করা যায়। তৎকালীন সময়ে মসজিদটি নির্মাণ করতে প্রায় 10 লাখ রুপি খরচ হয়। এই মসজিদ
নির্মাণে তুর্কি, আরব পারস্য এবং ইউরোপের প্রায় 5000 শ্রমিক কাজ করেছে। মসজিদ নির্মাণের তত্ত্বাবধানে ছিলেন শাহজাহানের উজির, সাদুল্লাহ খান এবং শাহজাহানের পরিবারের তত্ত্বাধায়ক ফজিল খান। ১৬৫ সালের জুলাই মাসের 23 তারিখে উজবেকিস্তানের বুখারী থেকে আগত সৈয়দ আবুল গফুর শাহ বুখারী মসজিদটির উদ্বোধন করেন। তিনি মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দিল্লি জামে মসজিদ হল শাহজাহানের শাসনামলে নির্মিত সর্বশেষ স্থাপত্য। বর্তমানে মসজিদ জাহান্নামা দিল্লির প্রধান মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দিল্লির বাসিন্দারা জুম্মা এবং দুই ঈদে এই মসজিদে একত্রিত হন। দিল্লি জামে মসজিদ একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ অন্য যেকোনো ঐতিহাসিক ভবনের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ এই
মসজিদে বিচরণ করে। শুধু মুসলিমরাই নয় হিন্দু খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষেরাও এই মসজিদের আঙ্গিনায় আশ্রয় নিতে পারে। শুধু ভারতেই নয় সমগ্র বিশ্বের পর্যটকদের কাছেই এই মসজিদ এক জনপ্রিয় আকর্ষণ। দিল্লি জামে মসজিদ মুঘল শাসন আমলে নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম মসজিদ হিসেবে বিবেচিত। মসজিদটিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে লাল বেলে পাথর। এছাড়া মসজিদ নির্মাণে সাদা মার্বেল এবং চুনা পাথরের সর্বোত্তম মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। তৎকালীন সময়ে এটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম মসজিদ। মসজিদের বাইরের অংশ এবং উঠান ফতেহপুর সিক্রীর জামে মসজিদের অনুকরণে নির্মিত এবং মসজিদের ভেতরের অংশ আগ্রার জামে মসজিদের সাথে মিল রয়েছে। দিল্লি জামে মসজিদ প্রকৃতপক্ষে একটি উন্মুক্ত মসজিদ। তাই এর
প্রধান প্রার্থনা কক্ষটি পুরো মসজিদের আঙ্গিনার তুলনায় বেশ ছোট। প্রার্থনা হলটির দৈর্ঘ্য 200 ফুট এবং প্রস্থ 88 ফুট। এর ছাদের উপর তিনটি মার্বেলের গম্বুজ আছে। যার শীর্ষভাগ সোনার তৈরি। প্রার্থনা কক্ষের পশ্চিম দেয়ালে সাতটি মিহিরাব আছে। মসজিদের গম্বুজগুলোর দুই পাশে দুটি মিনার রয়েছে। এই মসজিদে ঢোকার জন্য রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ। তিনতলা বিশিষ্ট পূর্ব পাশের দরজাটি সম্রাট এবং রাজকীয় ব্যক্তিদের প্রবেশের জন্য সংরক্ষিত ছিল। সাধারণ মানুষ প্রবেশ করার জন্য মসজিদের দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথ ব্যবহার করা হয়। জামে মসজিদের জায়নামাজ গুলো পাথর দিয়ে নকশা করা। মসজিদের দেয়ালে বহু ক্যালিগ্রাফি দেখা যায়। এগুলো সম্পূর্ণ পাথরের কাজ। এমনকি লেখার জন্যও কালী নয়। সরাসরি পাথর
কেটে অক্ষর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া বহু মূল্যবান এবং আধা মূল্যবান ধাতুও এসব কারো কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে সেগুলো হারিয়ে গেছে। এরকম ছোটখাট বহু নিখুত কাজের জন্যই তৎকালীন সময়ে 10 লক্ষ রুপি খরচ হয়েছিল। দিল্লি জামে মসজিদে প্রায় 25,000 মুসল্লী একসাথে নামাজ আদায় করতে পারে। মসজিদ জাহান্নামা বহুবার সংস্কার করা হয়েছে। ভারতের বহু সম্ভ্রান্ত মুসলিম মসজিদ সংস্কারের জন্য বহু অর্থ দান করেছেন। 1886 সালে রামপুরের নবাব মসজিদটি মেরামতের জন্য 1 লক্ষ 55 হাজার রুপি দান করেন। 1926 সালে হায়দ্রাবাদের নিজাম 1 লক্ষ রুপি দিয়েছিলেন মসজিদ সংস্কারের জন্য। 1948 সালে হায়দ্রাবাদের শেষ নিজাম সপ্তম আসাব জাহের কাছে
মসজিদের মেঝের চার ভাগের একভাগ মেরামতের জন্য 75 হাজার রুপি দান চাওয়া হয়েছিল নিজাম এর পরিবর্তে 3 লক্ষ রুপি দান করেন এবং বলেন মসজিদের বাকি অংশ দেখে যেন পুরনো মনে না হয় বৃষ্টি বাদল প্রখর রৌদ্র এবং দিল্লির ভয়ঙ্কর দূষণের কারণে মুঘল স্থাপত্যের এই রত্ন হুমকির মুখে। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার মসজিদটি সংস্কার করা [মিউজিক] হয়েছে। দিল্লির জামে মসজিদের ইমামরা ঐতিহ্যগতভাবে সম্রাট শাহজাহানের নিযুক্ত করা প্রথম ইমাম সৈয়দ আব্দুল গফুর শাহ বুখারীর সরাসরি বংশধর। তাদের পদবীকে শাহী ইমাম বা রাজকীয় ইমাম বলে অভিহিত করা হয়। এই মসজিদে পরবর্তীতে যিনি ইমাম হবেন তাকে বলা হয় নাইব ইমাম বা ডেপুটি ইমাম।
এই মসজিদের ইমামদের নামের শেষ অংশে বুখারী যুক্ত থাকে। তাদের পূর্বপুরুষ যে বোখারা থেকে আগত সেই বিষয়টিকেই নির্দেশ করে। অতীতের বোখারা অঞ্চল আধুনিক উজবেকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত। [মিউজিক] 1857 সালের সিপাহী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে ইংরেজরা ধারণা করেছিল যে দিল্লির মসজিদগুলোতে পরিকল্পনার মাধ্যমে মুসলিমরা বিদ্রোহ প্ররোচিত করেছিল। এর ফলে ব্রিটিশরা অনেক মসজিদ ধ্বংস করে দেয় এবং সকল মসজিদে মুসলিমদের ধর্মীয় সভা নিষিদ্ধ করে। ইংরেজরা তখন দিল্লি জামে মসজিদও বাজিয়াপ্ত করে এবং এই মসজিদের সকল ধর্মীয় ব্যবহারে বাধা দেয়। তারা কয়েকবার মসজিদটি ধ্বংস করারও পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু শেষমেষ ইংরেজরা জামে মসজিদকে শিখ এবং ইউরোপিয়ান সৈন্যদের ব্যারাক হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। যা ছিল মসজিদের জন্য
অবমাননাকর এবং অপবিত্র কাজ। ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন ব্রিটিশরা ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিমদের আবেগে আঘাত করার জন্যই এই মসজিদকে সামরিক ব্যারাক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। 1862 সালে ইংরেজদের কার্যক্রমের প্রতি মুসলিমদের ক্ষোভ বাড়তে থাকলে মসজিদটি আবার মুসলিমদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেসময় ব্রিটিশরা মুসলিমদেরকে কিছু শর্ত জুড়ে দেয়। এই মসজিদ শুধু প্রার্থনার কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং ইংরেজরা মসজিদের উপর নজরদারি করবে। ব্রিটিশদের শর্তগুলো প্রয়োগ করতে দিল্লির সম্মানিত মুসলিম ব্যক্তিদের নিয়ে জামে মসজিদ পরিচালনা পরিষদ গঠন করা হয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলে হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও হিন্দুরা প্রায়ই এই মসজিদে এসে মুসলিমদের সাথে ঔপনিবেশিক বিরোধী একাগ্রতা প্রকাশ করত।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় উপাসনালয় শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ। মসজিদটি আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে অবস্থিত। এই মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের নামানুসারে। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ শুধু আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় মসজিদই নয়, এই মসজিদ পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম। এছাড়া পৃথিবীর সুন্দরতম মসজিদগুলোর ভেতরেও শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ অনন্য। আরব আমিরাত যেভাবে নানান দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় জিনিসের রেকর্ড ধারণ করে আছে শেখ জায়েদ মসজিদও তার ব্যতিক্রম নয়| এই মসজিদের আঙ্গিনায় রয়েছে প্রায় এক লক্ষ 83 হাজার বর্গফুটের মার্বেল মোজাইক এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ আয়তনের মার্বেল মোজাইক এই মসজিদের প্রধান প্রার্থনা
কক্ষে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম গালিচা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই কার্পেটের আয়তন 60570 বর্গফুট এই কার্পেটের ওজন 35 টন। ইরানী শিল্পী আলী খালিদর ডিজাইনে এই গালিচা নকশা করা হয়েছে। নিউজিল্যান্ড এবং ইরানের উল দিয়ে কার্পেটটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল প্রায় দুই বছর। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঝাড়বাতিটিও শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদেই রয়েছে। এই ঝাড়বাতির ব্যাস 33 ফুট এবং উচ্চতা 49 ফুট। লক্ষ লক্ষ স্বচ্ছ স্ফটিক পাথর ব্যবহার করে ঝাড়বাতিটি তৈরি করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। পৃথিবীর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বৃহত্তম ঝাড়বাতিও এই মসজিদেই রয়েছে। এসব ঝাড়বাতি জার্মানিতে তৈরি করা হয়েছে। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে নির্মাণ সামগ্রীর প্রতিটি বিষয়ে
রয়েছে অনন্যতার ছোঁয়া। এই মসজিদ নির্মাণে কাজ করেছে বিশ্বের বিখ্যাত 38 টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। তাদের অধীনে প্রায় 3000 দক্ষ কর্মী এই মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছে। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ প্রকৃতপক্ষেই এক আন্তর্জাতিক মসজিদ। কারণ বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে মসজিদ নির্মাণের কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়েছে। ইতালি, জার্মানি, মরক্কো, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইরান, চীন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, গ্রিস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে। এসব দেশ থেকে নির্মাণ সামগ্রীর সাথে সাথে দক্ষ কারিগরদেরকেও নিয়ে আসা হয়েছিল। শেখ জায়েদ মসজিদের নকশায় পাকিস্তান, ভারত এবং মরক্কোর স্থাপত্য শৈলীর স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। সরকারি কোষাগার থেকে নির্মিত এই মসজিদ নির্মাণে খরচ হয়েছে 545 মিলিয়ন
মার্কিন ডলার। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের চার কোণে চারটি মিনারে পুষ্পোভিত নকশা রয়েছে। এসব মিনারের উচ্চতা 351 ফুট। মসজিদটিতে ছোট বড় সাত ধরনের 82 টি গম্বুজ আছে যা নির্মাণ করা হয়েছে শ্বেত মার্বেল দিয়ে। মসজিদের বৃহত্তম গম্বুজের উচ্চতা 279 ফুট। মসজিদ নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মার্বেল পাথর, মূল্যবান স্ফটিক পাথর এবং মূল্যবান মৃদ শিল্প। শেখ জায়েদ মসজিদের প্রধান নকশায় মুঘল এবং মুরসি মসজিদ, গম্বুজ বিন্যাস ও ফ্লোর বিন্যাসে লাহোরের বাদশাহী মসজিদ এবং মিনারে মরক্কোর দ্বিতীয় হাসান মসজিদের প্রভাব রয়েছে। মসজিদটি নির্মাণে ব্যবহৃত মার্বেল পাথর, সোনা, আধা মূল্যবান পাথর, স্ফটিক ও মৃতশিল্পের বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে আরবের 200 বছরের ইতিহাস,
ঐতিহ্য ও শিল্পচর্চার নমুনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পৃথিবী বিখ্যাত শিল্পীদের অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি এই মসজিদের সর্বত্রই চোখে পড়ে। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের প্রধান হল রুমে 7000 মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। এর সাথে রয়েছে দুইটি আলাদা প্রার্থনা হল। যার একেকটি 1500 জন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন। এর মধ্যে একটি হল মহিলাদের জন্য নির্ধারিত। এসব হলের সাথে আরো দুটি করে ছোট প্রার্থনা কক্ষ রয়েছে। প্রার্থনা হল কক্ষ ও আঙ্গিনা মিলিয়ে 40 হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। তবে জুম্মা ও ঈদের নামাজে সর্বমোট দেড় থেকে 2 লক্ষ মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের মাধ্যমে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও পরিচালনা
করা হয়। মসজিদ লাইব্রেরিতে আধুনিক ও ইসলামী বইয়ের এক অনন্য সংগ্রহশালা রয়েছে। অসাধারণ স্থাপত্য শৈলী আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় একাধিক রেকর্ডের কারণে সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে এই মসজিদ বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম। মক্কার পবিত্র কাবা ঘরের আদলে চার কোনা আকৃতিতে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই মসজিদে একসঙ্গে 40 হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। নান্দনিক এই মসজিদটির নকশা করেছেন পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের স্থপতি এএইচ থারানানি। বাংলাদেশের 10 টাকার নোটে বায়তুল মোকাররমের ছবি আছে। বর্তমানে দেশের জাতীয় মসজিদের মর্যাদা অর্জন করলেও বায়তুল মোকাররম নির্মাণ করা হয়েছিল একটি পারিবারিক মসজিদ হিসেবে। পাকিস্তান আমলে ঢাকার বড় শিল্প উদ্যোক্তা বাওয়ানী পরিবারের পক্ষ
থেকে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়। 1959 সালে বাওয়ানী জুটমিলস এর মালিক উর্দুভাষী আব্দুল লতিফ বাওয়ানী এবং তার ভাতিজা ইয়াহিয়া বাওয়ায়ানী, বায়তুল মোকাররম মসজিদ সোসাইটি গঠন করে মসজিদটি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। 1960 সালের 27 শে জানুয়ারি আব্দুল লতিফ বাওয়ানী মসজিদ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর দুই বছর পর 1962 সালে মসজিদ নির্মাণের কাজ মোটামুটি শেষ হয়। তবে সম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে 1968 সাল পর্যন্ত সময় লেগে [মিউজিক] যায়। বায়তুল মোকাররম মসজিদ প্রায় সাড়ে আট একর জমির উপর নির্মাণ করা হয়েছে। 60 এর দশকের শুরুতে এই জায়গায় একটি বড় পুকুর ছিল। সেটি পল্টন পুকুর নামেও পরিচিত ছিল। পুকুরটি ভরাট করার পর
মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়েছিল। বায়তুল মোকাররম মসজিদটি নির্মিত হয়েছে পুরনো ঢাকা এবং নতুন ঢাকার মিলনস্থলে। এই মসজিদ নির্মাণের অনেক আগে থেকেই নতুন ঢাকার সীমানা বাড়তে থাকে। ফলে পুরনো ও নতুন দুই ঢাকার মানুষের কথা মাথায় রেখেই এই জায়গা নির্বাচন করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে বায়তুল মোকাররমের ওই জায়গাটি নগরীর কেন্দ্রস্থল হিসেবেও বিবেচনা করা হতো। মসজিদের মূল ভবনটি আটতলা। যা মাটি থেকে 99 ফুট উঁচু। আট তলা এই মসজিদের নিচতলায় মার্কেট এবং গোদাম ঘর রয়েছে। মসজিদের উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব দিকে তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে। বায়তুল মোকাররম মসজিদটি প্রথমে 30 হাজার মানুষের নামাজ আদায়ের সুযোগ রেখে নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে 2008 সালে
সৌদি সরকারের অর্থায়নে মসজিদের সম্প্রসারণ করা হয়। এর ফলে এখন একসঙ্গে 40000 মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। বিরাট এই মসজিদটিতে আয়োজিত জুম্মা কিংবা ঈদের নামাজে এত ভিড় হয় যে বহু মানুষকে বাইরেও নামাজ পড়তে হয় দোতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত প্রতি তলায় নামাজ পড়া হয় আর খতিব বা ইমাম নামাজ পড়ান দোতলা থেকে তিনতলার উত্তর পাশে নারীদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা আছে সেখানে একসঙ্গে 1500 নারী নামাজ আদায় করতে পারেন রমজান মাসের শেষ 10 দিনে মধ্যরাতের পর তাহাজ্জুদ নামাজেরও জামাতের আয়োজন করা হয় তাহাজ্জুদের নামাজেও অনেক মুসল্লি অংশ নেন। শুক্রবারে জুম্মার নামাজে বায়তুল মোকাররম মসজিদে উপচে পড়া ভিড় হয়। আর প্রতি ঈদে
পাঁচটি করে জামাত হয়। প্রতি জামাতেই হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করে। ঈদের কয়েকটি জামাতে বায়তুল মোকাররমের লাখো মানুষ নামাজ আদায় করেন। প্রতিবছর পবিত্র রমজান মাসে নিয়মিত প্রায় 5000 মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হয়। এই ইফতার আয়োজনের অর্থান করে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত দুই বছর ইফতার আয়োজন বন্ধ রাখা হয়েছে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের নকশা বা স্থাপত্য শৈলীর মাঝে ভিন্ন ধরনের আকর্ষণ রয়েছে। সে কারণে দেশী বিদেশী অনেক পর্যটক বায়তুল মোকাররম মসজিদ দেখতে আসে। বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত বিখ্যাত প্রাচীন স্থাপনা সাট গম্বুজ মসজিদ। মসজিদের নাম সাট গম্বুজ হলেও মসজিদে গম্বুজের সংখ্যা মোট 81 টি। বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী
স্থানের একটি 60 গম্বুজ মসজিদ। 1985 সালে শুধু এই মসজিদই নয় সম্পূর্ণ বাগেরহাট শহরকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কারণ অতীতে খলিফাতাবাদ নামে পরিচিত এই অঞ্চলে 360 টি মসজিদ, গণভবন, সৌধ, সেতু, রাস্তা, পানি সরবরাহের ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। শার্ট গম্বুজ মসজিদের গায়ে কোন শিলালিপি না থাকার কারণে এই ভবন নির্মাণের সঠিক সময় সম্পর্কে জানা যায় না। তবে মসজিদের স্থাপত্য শৈলী দেখলে সহজেই বোঝা যায় এটি খানজাহান আলী নির্মাণ করেছিলেন। খানজাহান আলী দিল্লিতে জন্মগ্রহণকারী তুর্কি বংশোদ্ভূত এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম। তিনি কুরআন হাদিস সুন্নাহ এবং ফিকাহ শাস্ত্রের পন্ডিত ছিলেন 1394 সালে মাত্র 26 27 বছর বয়সে তিনি জৈনপুরের
গভর্নর হন। পরবর্তীতে 60 হাজার সুশিক্ষিত সেনাদল সহ তিনি বাংলা অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। সুন্দরবনের কোল ঘেসে খানজাহান আলী খলিফাতাবাদ রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তিনি তার রাজ্যের বৈঠক করার জন্য একটি দরবার হল নির্মাণ করেন যা পরবর্তীতে সাট গম্বুজ মসজিদে পরিণত হয়। ধারণা করা হয় 1500 শতাব্দীতে খানজাহান আলী সাট গম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেছেন। 60 গম্বুজ মসজিদে তুঘলকী ও জৈনপুরি নির্মাণ শৈলীর সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। এই মসজিদটি বহু বছর ধরে এবং বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদ নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত পাথরগুলো আনা হয়েছিল অতীতের সুবা বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে।শাটগম্বুজ শার্টগম্বুজ মসজিদ উত্তর-দক্ষিণের বাইরের দিকে প্রায় 160 ফুট ও ভেতরের
দিকে প্রায় 143 ফুট লম্বা এবং পূর্ব পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় 104 ফুট ও ভেতরের দিকে প্রায় 88 ফুট চওড়া। মসজিদের দেয়ালগুলো প্রায় সাড়েট ফুট পুরু। মসজিদের ভেতরে 60টি স্তম্ভ বা পিলার আছে। এগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে ছয় সাড়িতে অবস্থিত এবং প্রত্যেক শাড়িতে 10 টি করে স্তম্ভ আছে। প্রতিটি স্তম্ভই পাথর কেটে বানানো। শুধু পাঁচটি স্তম্ভ বাইরে থেকে ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এই 60টি স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালের উপর গম্বুজ তৈরি করা হয়েছে। শার্ট গম্বুজ মসজিদে পূর্ব দেয়ালে 11 টি বিরাট আকারের খিলান যুক্ত দরজা আছে। মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে সাতটি করে দরজা।
মসজিদের চার কোনে চারটি মিনার আছে। এগুলোর নকশা গোলাকার এবং মিনারগুলো উপরের দিকে শুরু হয়ে গেছে। এদের কার্নিশের কাছে বলা আকার ব্যান্ড ও চুরাই গোলাকার গম্বুজ আছে। সামনের দুটি মিনারে প্যাঁচানো সিঁড়িও আছে। অতীতে এখান থেকে আযান দেওয়া হতো। এই মিনারের একটির নাম রওশন কোঠা। অপরটির নাম আন্ধার কোঠা। মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে দশটি মিহিরাব আছে মাঝের মিহিরাবটি আকারে বড় এবং কারুকার্যমন্ডিত এই মেহরাবের দক্ষিণে পাঁচটি ও উত্তরে চারটি মেহরাব আছে মাঝের মেহরাবের ঠিক পরের জায়গাতে একটি ছোট দরজা আছে খানজাহান এই মসজিদটিকে নামাজের কাজ ছাড়াও দরবারঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন মেহরাবের পাশের দরজাটি ছিল দরবার ঘরের প্রবেশপথ অনেকের মতে অতীতে
60 গম্বুজ মসজিদটি মাদ্রাসা হিসেবেও ব্যবহৃত [মিউজিক] হয়েছে। 60 গম্বুজ মসজিদের মূল গম্বুজের সংখ্যা 77 টি। 77 টি গম্বুজের মধ্যে 70 টি গম্বুজ গোলাকার এবং সাতটি গম্বুজ বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের মতো। এছাড়া মসজিদের মিনারে চারটি গম্বুজ আছে। সব মিলিয়ে গম্বুজের সংখ্যা দাঁড়ায় মোট 81 টি। তবুও এর নাম হয়েছে শার্ট গম্বুজ। ঐতিহাসিকরা মনে করেন সাতটি গম্বুজের শাড়ি আছে বলে এই মসজিদের নাম হয় সাত গম্বুজ এবং কালক্রমে তা গম্বুজ নামে পরিচিত হয়েছে। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন গম্বুজগুলো 60টি পাথরের স্তম্ভের উপর অবস্থিত বলেই নাম হয়েছে 60 গম্বুজ। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন ছোটসোনা মসজিদ। ছোট সোনা মসজিদকে বলা হয়
সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়নগরীর উপকণ্ঠে ফিরোজপুর গ্রামে এ স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছে। যা বর্তমানে বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের চাপাই নবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার মধ্যে পড়েছে। অতীতে ছোট সোনা মসজিদের বাইরের দিকে সোনালী রঙের আস্তরণ ছিল। সূর্যের আলো পড়লে সেই রং সোনার মতো ঝলমল করত। সেজন্য এর নাম হয়েছে সোনা মসজিদ। প্রাচীন গৌর নগরীতে সুলতান নুসরত শাহ অনেকটা একই রকম আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন তবে সেটি ছিল আরো বড়। তাই স্থানীয় লোকজন গৌড়নগরীর মসজিদটিকে বলতো বড়সোনা মসজিদ। আর নগরীর বাইরে থাকা এই মসজিদকে বলতো ছোট সোনা মসজিদ। বাংলাদেশের 20 টাকার নোটে ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদের ছবি আছে। [মিউজিক] মসজিদের মাঝের
দরজার উপরে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায় ওয়ালী মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। তবে শিলালিপিতে নির্মাণের তারিখ সম্মলিত অক্ষরগুলি মুছে যাওয়ার কারণে সঠিক নির্মাণকাল জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় 1494 থেকে 1519 সালের মধ্যে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। ছোটসোনা মসজিদ মুসলিম স্থাপত্যের এক অন্যতম নিদর্শন। মসজিদটি হোসেন শাহ স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত। ছোটসোনা মসজিদ উত্তর-দক্ষিণে 82 ফুট লম্বা এবং পূর্ব পশ্চিমে সাড়ে 52 ফুট চওড়া। এই মসজিদের উচ্চতা 20 ফুট এবং দেয়ালগুলো প্রায়ছ ফুট পুরু। মসজিদের দেয়ালগুলো ইটের তৈরি হলেও দেয়ালের ভেতরে ও বাইরে পাথর দিয়ে ঢাকা রয়েছে। মসজিদের চার কোণে
চারটি বুরুজ আছে। এগুলো অষ্টকণাকার। ছাদের কার্নিশ পর্যন্ত উঁচু বুরুজগুলো ধাপে ধাপে নকশা করা আছে। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে পাঁচটি খিলান যুক্ত দরজা আছে। খিলানগুলো বহু ভাগে বিভক্ত। এগুলো অলংকরণে সমৃদ্ধ। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে তিনটি করে দরজা। তবে উত্তর দেয়ালের সর্ব-পশ্চিমের দরজাটির জায়গায় রয়েছে সিঁড়ি। এই সিঁড়ি দিয়ে মসজিদের ভেতরে দোতলায় অবস্থিত একটি বিশেষ কামরায় যাওয়া যায়। কামড়াটি পাথরের স্তম্ভের উপর অবস্থিত। গঠন অনুসারে কামড়াটিকে জেনানা মহল বা নারীদের জন্য নির্ধারিত স্থান হিসেবে ধারণা করা হয়। তবে অনেকের মতে এটি জেনানা মহল ছিল না। এটি ছিল সুলতান বা শাসনকর্তার নিরাপদে নামাজ আদায়ের জন্য বিশেষ কক্ষ। ছোটসোনা মসজিদের ভেতরে কালো
ব্যাসেল্টের আটটি স্তম্ভ রয়েছে। স্তম্ভগুলো দ্বারা মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে তিনটি আইল ও পূর্ব পশ্চিমে পাঁচটি শাড়িতে বিভক্ত। পূর্ব দেয়ালের পাঁচটি দরজা বরাবর পাঁচটি মেহিরাব আছে। মেহরাব গুলোতে পাথরের অলংকরণ রয়েছে। সর্ব উত্তরের মেহরাবটির উপরে দোতালার কামড়াটিতেও একটি মেহরাব রয়েছে। মসজিদের আটটি স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালের উপর তৈরি হয়েছে মসজিদের 15 টি গম্বুজ। মসজিদের বাইরের যেকোনো পাশ থেকে তাকালে কেবল পাঁচটি গম্বুজ দেখা যায়। মাঝের গম্বুজগুলো বাংলার চৌচালা ঘরের মত। সোনা মসজিদের অলংকরণে মূলত পাথর, ইট, টেরাকোটা ও টাইল ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে পাথর খোদায়ের কাজই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। মসজিদের সম্মুখ ভাগ বুরুজ এবং দরজায় পাথরের অত্যন্ত মিহি নকশা খোদাই
করা হয়েছে। [মিউজিক] ছোটসোনা মসজিদের আঙ্গিনায় ঢোকার পথে একটি তরুণ রয়েছে। তরুণটি মসজিদের মাঝের দরজা বরাবর অবস্থিত। অতীতে এই তরুণের সাথে মসজিদের চারপাশে পাচিল ছিল। কিন্তু সেই পাঁচিলের প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তার বদলে চারপাশে কাঁটা তারের বেষ্টননি দেওয়া আছে। মসজিদের আঙ্গিনায় বাঁধানো মঞ্চের উপর দুটো কবর রয়েছে। কবর দুটো কার সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায় না। কেউ কেউ ধারণা করেন কবর দুটি সোনা মসজিদ নির্মাতা ওয়ালী মোহাম্মদ ও তার স্ত্রীর কবর। আবার অন্যরা অনুমান করেন এগুলো ওয়ালী মোহাম্মদ ও তার পিতা আলীর কবরও হতে পারে। ঢাকার এক ঐতিহ্যবাহী মসজিদ পুরান ঢাকার তারা মসজিদ। এই মসজিদের ছবি আমরা
প্রতিদিনই দেখি। কিন্তু কখনো হয়তো ভালোভাবে খেয়াল করা হয় না। বাংলাদেশের বহুল ব্যবহৃত 100 টাকার নোটে বিখ্যাত এই মসজিদের ছবি আছে। 18 শতকের প্রথম দিকে তারা মসজিদ নির্মিত হয়। সাদা মার্বেলের গম্বুজের উপর নীল রঙঙা তারায় খচিত নকশার কারণে মসজিদের নাম হয়েছে তারা মসজিদ। অনেকের কাছে এটি সীতারা মসজিদ নামেও পরিচিত। পুরান ঢাকার আরমানি টোলায় আবুল খয়রাত সড়কে তারা মসজিদ অবস্থিত। অতীতে আরমানি টোলার নাম ছিল মহল্লা আলে আবু সাঈদ। আবু সাঈদ ছিলেন অত্যন্ত ধর্ণঢ্য ব্যক্তি। তার নাতি জমিদার মির্জা গোলামপীর ওরফে মির্জা আহমেদ জান তারা মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে মসজিদটি মির্জা সাহেবের মসজিদ নামে বেশ পরিচিতি পায়। মসজিদের
গায়ে কোন নির্মাণ তারিখ খোদাই করা ছিল না। সে কারণে তারা মসজিদ কবে প্রথম নির্মিত হয়েছিল সে সম্পর্কে পরিষ্কার করে কিছু জানা যায় না। তবে 1860 সালে মির্জা গোলাম পীর মারা যাবার পর এই মসজিদের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। 1926 সালে ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী আলীজান ব্যাপারী তারা মসজিদের ব্যাপক সংস্কার কাজ করেছিলেন। অতীতে তারা মসজিদের দৈর্ঘ্য ছিল 33 ফুট এবং প্রস্থ 12 ফুট। বর্তমানে মসজিদটির দৈর্ঘ্য 70 ফুট এবং প্রস্থ 26 ফুট। ১৯২৬ সালে আলিজানের সংস্কারের সময় মসজিদের পূর্বদিকে একটি বারান্দা যুক্ত করা হয়। সে সময় জাপানের চকচকে রঙিন চিনি টিক্রি টাইলস ব্যবহার করে মসজিদের মোজাইক এবং কারো কাজ সম্পন্ন
করা হয়। মির্জা গোলামের সময় মসজিদটি ছিল তিন গম্বুজ ওয়ালা। 1987 সালের সংস্কারের পর দুটি গম্বুজ যুক্ত করা হয়। ফলে গম্বুজের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচটি। পুরনো একটি মেহরাব ভেঙে নতুন দুটো গম্বুজ আর তিনটি নতুন মেহরাব বানানো হয়। বর্তমানে মসজিদের সামনের আঙ্গিনায় বিশাল তারকার আকৃতির একটি ফোয়ারা রয়েছে। তারা মসজিদের নকশা ও নির্মাণে মুঘল স্থাপত্য শৈলীর প্রভাব রয়েছে। 17 শতকে দিল্লি, আগ্রা ও লাহোরে নির্মিত বহু স্থাপত্যকর্মের সাথে তারা মসজিদের বেশ মুহাম্মদ শব্দের অর্থই হল প্রশংসিত। মুসলিমদের মতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর বার্তাবাহক এবং অমুসলিমদের মতে তিনি ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রবর্তক। 570 সালে পবিত্র মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত
কুরাইশ বংশে এই মহামানব জন্মগ্রহণ করেন অধিকাংশ ইতিহাসত্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা কারণ তিনি আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেছিলেন। 1978 সালে সমকালীন ঐতিহাসিক ও গণিতবিদ মাইকেল হার্ট বিখ্যাত কয়েকজন ইতিহাসবিদ এবং জীবনী গ্রন্থ লেখকদের সহায়তায় একটি বই রচনা করেন। তাদের এই বই রচনার উদ্দেশ্য ছিল সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী 100 জন মনীষীর জীবনী সংকলন করা। অর্থাৎ যাদের কর্মের দ্বারা এই পৃথিবী সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে| এই তালিকা তৈরি করতে তারা 32 টি বিশেষ ক্যাটাগরি বা যোগ্যতার উপর নির্ভর করে মাইকেল হার্ট এর নেতৃত্বে গবেষকগণ
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই তালিকায় এক নম্বরে রাখতে বাধ্য হয় এ বিষয়ে কারো দ্বিমত পোষণ করার কোন সুযোগ ছিল না কারণ সকল ক্যাটাগরিতেই তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের নিজের যোগ্যতা বলে এই অবস্থান অর্জন করে নিয়েছেন। মাইকেল হার্ট বলেছিলেন, আমি একজন খ্রিস্টান হিসেবে এই তালিকায় সবার উপরে যীশুখ্রীষ্টকে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বেশ কয়েকটি যোগ্যতার অভাবের কারণে তাকে তালিকায় এক নম্বরে জায়গা দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ যীশুখ্রীষ্ট কোন রাষ্ট্রনায়ক শাসক বা যোদ্ধা ছিলেন না এমনকি যিশু খ্রীষ্টের কোন পরিবার বা স্ত্রী সন্তানও ছিল না। সেজন্য মাইকেল হার্ট সহ তার সহযোগী সকলে এক বাক্যে স্বীকার
করে নিতে বাধ্য হয় পৃথিবীতে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমকক্ষ আর কেউ নেই। মাইকেল হার্ট আরো বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম কে নির্বাচন করায় অনেকে অবাক হয়েছে। কিন্তু সর্বকালের ইতিহাসে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেছেন। বিখ্যাত লেখক জর্জ বার্নার্ড সহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মানবতার ত্রাণকর্তা আখ্যা দিয়ে বলেন তিনি যদি আধুনিক পৃথিবীর শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করতেন তাহলে তিনি অবশ্যই সকল সমস্যার সমাধান করতে সফল হতেন সেই সাথে আসতো পৃথিবীর জন্য অতি জরুরি সুখ শান্তি এছাড়াও আরো বহু অমুসলিম ইতিহাস বিখ্যাত
ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শের ভুয়সী প্রশংসা করেছেন। [মিউজিক] বিগত প্রায়দেড় হাজার বছর ধরে শত শত কোটি মুসলিম হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা চর্চা করে আসছে। অক্ষর জ্ঞানশূন্য একজন অনাথ শিশু যে কিনা মরুভূমির কঠোর পরিবেশে পিতা-মাতা ছাড়া বড় হয়েছেন তিনি তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বরবর এবং অনগ্রসর সমাজকে চরম উন্নত এক সভ্যতায় পরিণত করেছিলেন। তিনি একমাত্র দার্শনিক, যে কিনা তার জীবদ্দশায় নিজের দর্শনকে সমাজে শতভাগ প্রতিষ্ঠিত করতে সফল হয়েছিলেন। তিনি সারাজীবন ক্ষমা ও ঔের সাধনা করেছেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় জন্মগ্রহণ করে সেখানেই বড় হন| এবং তার সততার কারণে তৎকালীন সমাজের লোকেরা তাকে বিশ্বাসী
উপাধি দেয়। কিন্তু তিনি যখন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত শান্তির বাণী প্রচার করতে শুরু করেন, তখন মক্কাবাসী ও তার নিজের আত্মীয়দের দ্বারা চরম নির্যাতিত হন। এরপর তাকে অন্যায়ভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচতে তিনি স্থায়ীভাবে মদিনায় বসবাস করতে শুরু করেন। তার 23 বছর পর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। সে সময় তিনি ইতিহাসের অন্যান্য বিজয়ী শাসকদের মতো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। বরং যারা তাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল, নির্মম অত্যাচার করেছিল, তার অনুসারীদেরকে বিনা কারণে হত্যা করেছিল, সেই বরবর লোকদের উদ্দেশ্যে তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তিনি যা শিক্ষা দিতেন, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তা নিজে বাস্তবায়ন করে
দেখিয়ে গিয়েছেন। তার মোহনীয় ব্যক্তিত্বের স্পর্শে সমগ্র আরব উপদ্বীপে শান্তি, সাম্য ও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি দেশ এবং একটি সরকারের আকারে| তিনি একজন অনাথ বালক থেকে বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন| কিন্তু তারপরও তার জীবনে বিন্দুমাত্র কোন পরিবর্তন আসেনি। বিশাল রাজত্ব লাভের পরেও তিনি ঠিক আগে যেমন খাবার খেতেন, যেমন পোশাক পড়তেন, ঠিক তেমনি চালিয়ে গেছেন। তিনি কোন প্রাসাদ নির্মাণ করেননি। অতি সাধারণ মাদুর বিছিয়ে মাটিতে ঘুমিয়েছেন। এমনকি এত বড় একজন শাসক তার জামা ছিড়ে গেলে নতুন জামা না কিনে নিজেই ছেড়া জামা সেলাই করে নিতেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত ন্যায়পরায়ণ এবং ন্যায্য শাসক। পৃথিবীর ইতিহাসে
অন্য কোন বিজয়ী শাসকের মতো তিনি তার রাজত্ব তার বংশধরদের কাছে হস্তান্তর করেননি। তিনি বিচার করার সময় তার বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজনদের প্রাধান্য দিতেন না। সকলের জন্য তার আইন ছিল সমান। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো মৃত্যুর পরের জীবনকে কেন্দ্র করে। একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর উপাসনা করা ছিল তার প্রধান বার্তা। সেই সাথে পৃথিবীর সকল ধরনের অন্যায় অত্যাচার সমূলে ধ্বংস করা ছিল তার লক্ষ্য। তিনি মানবজাতির এমন একজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি সবসময় উত্তম চরিত্র গঠনের শিক্ষা দিয়ে গেছেন এবং নিজের জীবনকে সর্বোত্তম চরিত্রের আদর্শ হিসেবে রেখে গেছেন। রাজত্ব অর্জন করতে বা ধরে রাখতে তিনি কোন কূট চক্রান্তের আশ্রয়
নেননি। আর এখানেই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য সকল শাসক থেকে আলাদা। তিনি জীবনে কোনদিন তার স্ত্রী চাকর বন্ধু এমনকি শত্রুর গায়েও হাত তোলেননি। শুধুমাত্র সেই শত্রুদেরকেই তিনি মোকাবেলা করেছেন যারা আল্লাহর হুকুম এবং তার বার্তার প্রতি সরাসরি বিরোধিতা করে তার উপর আক্রমণ করেছে। সেক্ষেত্রেও তিনি তা প্রতিহত করেছেন মাত্র। সাধারণত কোন সম্রাট বা শাসক নিজে যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি অংশগ্রহণ করে না। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সমরনায়ক এবং অকুতভয় বীর যোদ্ধা। তিনি সৈন্যদলের পেছনে না থেকে সরাসরি শত্রুদের মাঝে গিয়ে যুদ্ধ করেছেন। একই সাথে আবার তিনি ছিলেন শান্ত, মার্জিত এবং সকলের প্রতি আন্তরিক। একজন শাসকের যা যা দায়িত্ব
থাকে দিনের বেলায় তিনি সেই সকল কাজ করতেন। এছাড়া রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন। বিচারকের দায়িত্ব পালন করতেন। অতিথিদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। দরিদ্রদের খাবার দিতেন। অসুস্থকে দেখতে যেতেন। নিজের ব্যক্তিগত কাজ নিজেই করতেন। একজন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে একজন শাসক যা যা কাজ করে তিনি তার সবই করতেন। এরপর রাতের বেলা তিনি দীর্ঘ প্রার্থনায় মনোনিবেশ করতেন। প্রতি রাতে একটানা চারপাঁচ ঘন্টা নামাজে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তার পা ফুলে যেত। কিন্তু পরের দিন সকাল থেকে আবারো ইসলামী জীবন বিধান শিক্ষা দেওয়া পবিত্র কুরআন ব্যাখ্যা করা সহ যাবতীয় কাজ নিরালসভাবে করে যেতেন। একজন মানুষ কিভাবে একসাথে সবগুলো কাজ সঠিকভাবে করতে পারে। পারিবারিক,
সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন উৎকর্ষতার চূড়ান্ত উদাহরণ। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া ইতিহাসে এমন নজির আর দ্বিতীয়টি নেই। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার শাসনামলে একজন রাজা আর একজন দাসের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। তিনি ধনী গরীব নির্বিশেষে সবাইকে এক কাতারে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। পশ্চিমারা আজীবন বর্ণবাদের কুচিত চর্চা করে সাম্প্রতিক সময়ে খুব সাধু সাজার চেষ্টা করে। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণবাদ বিলুপ্ত করেছিলেন আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে তিনি সেই প্রাচীনকালেই বলে গেছেন কালোর উপর সাদার কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই শুধু তাই নয় তৎকালীন সময়ে সারা পৃথিবীতে নারী অধিকার ছিল উপেক্ষিত
নারীদেরকে অনেকাংশে মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না সেখানে তিনি নারীদেরকে সম্পত্তি লাভের অধিকার প্রদান সহ নানান ক্ষেত্রে নারী অধিকার নিশ্চিত করেছেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম তার জীবনে কখনো কোনদিন মিথ্যা কথা বলেননি কিন্তু এই মহামানবের প্রতি সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার হলো তিনি নাকি পবিত্র কুরআন নিজে রচনা করেছেন। অথচ তিনি পড়ালেখা জানতেন না। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় কুরআন তার রচনা সেক্ষেত্রে এই গ্রন্থ জুড়ে তার নিজের গুণগান বেশি বেশি থাকার কথা ছিল। কিন্তু পবিত্র কুরআনে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনার চেয়ে ইহুদি ধর্মের নবী হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম এবং খ্রিস্টান ধর্মের নবী হযরত ঈসা আলাইহিস
সাল্লাম বা যিশু খ্রীষ্টের বর্ণনাই কুরআনে বেশি এসেছে। মুসলিম এবং অমুসলিম সকলেরই উচিত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আরো গভীরভাবে জানার চেষ্টা করা। কেউ যদি মুক্ত মনে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম সম্পর্কে অধ্যয়ন করে তাহলে এই মহামানবের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জাগবেই। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ যে ব্যক্তি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবে, সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসারী হতে বাধ্য। আমাদের সকলেরই উচিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মানবের জীবন এবং কর্মকে অনুধাবন করে তাকে তার যোগ্য সম্মানটুকু দেওয়া। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামকে শুধু একটি ধর্ম নয় রাষ্ট্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার অন্তর্ধানের পর ইসলামী
সরকার ব্যবস্থা যেভাবে পরিচালিত হয়েছে তাকে বলা হয় খিলাফাত। খিলাফাত সরকার ব্যবস্থার প্রধান হলেন একজন খলিফা। 632 সালে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে শুরু করে 1924 সালে সর্বশেষ অটমান