আসসালামু আলাইকুম বন্ধুরা আশা করি আপনারা সকলেই ভালো আছেন আর আপনারা দেখছেন এমডি ভয়েস টিভি প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের অনেক আগের কথা বনী ইসরাইল গোত্রের জুরাইজ নামের এক যুবক ছিল পরিবারে তার মা ছাড়া আর কেউ ছিল না বড় সাদা মাঠা বালক বেশভূষা চলাফেরায় খুব নম্র প্রকৃতির লোকালয়ের কলহ চিৎকার তার মোটেই পছন্দ নয় একাকি নিরে থাকাটাই ছিল তার কাছে বেশি স্বাচ্ছন্দের কিন্তু কদিন হলো জুরাইস একদম জনবিচ্ছিন্ন কোথাও তার দেখা নেই এমনকি বাড়িতেও ফিরছে না শোনা যাচ্ছে সে নাকি জঙ্গলে একটি নীরব খুবতে অবস্থান নিয়েছে নস্বর পৃথিবীর ব্যস্ততা থেকে সে একটু মুক্তি পেতে চায়
মহান প্রভুর একান্ত সান্নিধ্য অর্জনে ধন্য হতে চাই কলিজার টুকরা সন্তানের জন্য মায়ের মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠলো না খাওয়া না দেওয়া ছেলেটি কোথায় কিভাবে পড়ে আছে ভেবে মায়ের মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো তাই জুরাইজের মা খুঁজতে খুঁজতে তাকে জঙ্গলের এক খুবতে আবিষ্কার করল না আছে আলো বাতাস আর না আছে বিছানাপত্র ডালপালার ছাউনি বেষ্টিত এক জীর্ণ কুটিরে নিজের প্রাণের ধন এভাবে পড়ে আছে দেখেই মায়ের ভেতরটা ডুকরে কেঁদে উঠলো মা বললেন চল বাবা বাড়িতে চল কিন্তু জুরাইস কিছুতেই বাড়িতে ফিরতে রাজি নয় মা নিজের একাকিত্ব ও অপরাগতার কথা বলেও দোহাই দিলেন কিন্তু জুরাইস তাতেও কর্ণপাত করল না বলল হে আল্লাহ
একদিকে আমার মা আর অপরদিকে আমার ইবাদত আমি কোনটি বেছে নেব এ বলে সে নামাজে দাঁড়িয়ে গেল অগত্যা তার মা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে গেলেন কিন্তু মায়ের মন বলে কথা থেকে তার বিষন্নতা আরো বেড়ে চলল পরের দিন তিনি আবার আসলেন জুরাইজকে বললেন বাবা চল আমার সাথে বাড়িতে আমি একা মানুষ বৃদ্ধ বয়সে তুই ছাড়া আমার দেখাশোনার কে আছে কিন্তু জুরাইজের চিন্তার জগতে ভিন্ন কিছু ভর করে বসে আছে জুরাইজ পারলো না যে মায়ের সেবার গুরুত্ব নহল নামাজের চেয়েও বহু গুণ বেশি সে বলল হে আল্লাহ একদিকে আমার মা আর অপরদিকে আমার ইবাদত আমি কোনটি বেছে নিব আজকেও সে নামাজে
মনোনিবেশ করল আর তার মা অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে ফিরে গেলেন পরের দিনও একই ঘটনা জুরাইস তার নির্ভরতার উপর অটল সে ভাবছে আমি তো আল্লাহর ইবাদতের মত মহান কর্মে মশগুল মায়ের সেবার গুরুত্ব এর কাছে কিছুই নয় সুতরাং আজকেও সে মায়ের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করল নিজের ছেলের এহেন আচরণে জুরাইজের মা খুব ব্যথিত হলেন ধৈর্যের চরম সীমা উপেক্ষা করেছে ছেলে মায়ের অনুরোধ এভাবে ফিরিয়ে দিতে পারলো নিজের অজান্তে মুখ থেকে খুব কঠিন কথা বলে ফেললেন ছেলেকে বদদোয়া করলেন আর মায়ের বদদোয়া তো অবসম্ভবই হে আল্লাহ কোন নষ্টা মেয়ের চক্রান্তের শিকার না হয়ে যেন ওর মৃত্যু না হয় ব্যাস মায়ের বদদোয়ার ফল
ফুলতে বেশি সময় লাগলো না এক কান দুই কান করে জুরাইজ আর তার মায়ের ঘটনার সারা এলাকায় জানাজানি হয়ে গেল সব জায়গায় এখন একটাই কথা কি ছেলের রে বাবা নিজের মাকে এভাবে একা ফেলে জঙ্গলে গিয়ে বৈরাগী সেজেছে এটা আবার কেমন দরবেশ ইত্যাদি ইত্যাদি শুধু কি তাই তারা জুরাইজকে নিয়েও গভীর ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি নিল তাকে একটু শায়েস্তা করা দরকার যে করেই হোক তার মুখে চুলকালি দিতেই হবে কিন্তু কি করা যায় তারা সিদ্ধান্ত নিল যে কোন এক দুশ্চরিত্রা নারীকে তার পেছনে লাগাতে হবে কেলেংকারীর অভিযোগ তুলে তাকে ওই জায়গা ছাড়া করতে হবে সেম মতে এলাকার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েকে প্রস্তুত করা
হলো সেও খুব উৎসাহের সাথে রাজি হয়ে গেল আজ রাতেই তারা কিছু করবে মেয়েটি যথাসময় জুরাইজের ইবাদতখানায় পৌঁছালো রূপ লাবণ্য আর বাহারি সজ্জায় তার সারা গা ছেয়ে আছে ছলনা ভরা চোখে কামনীয় ভঙ্গিতে জুরাইজকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করল কিন্তু একি এ যেন একটা আস্ত পাথর কোন ভাব নেই নেই কোন অনুভূতি একবার তাকে দেখারও প্রয়োজন মনে করল না সে যাকে কাছে পাওয়ার জন্য সারা শহর মাতোয়ারা তাকে এভাবে একান্তে পেয়েও এমন অবজ্ঞা নিঃসত্তার রেহেন অপমান সইতে না পেরে মেয়েটি জিদে অধীর হয়ে গেল আজ পর্যন্ত কারো সামনে এতটা ফিকে হয়নি সে রাগ আর ক্ষোভে সারাদেহ জ্বলে যাচ্ছে তার
ঠিক করল যে করেই হোক জুরাইজের থেকে এই অপমানের বদলা গ্রহণ করতেই হবে তাকে ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করতেই হবে পাশে ছিল এক রাখাল মেয়েটি সেই মুহূর্তেই ওই রাখালের সাথে নিজের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করল আর সুযোগের অপেক্ষায় থাকলো যে এ বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হলে জনসমূহে তাকেই জুরাইজের সন্তান বলে প্রচার করবে তবেই তার চিত্ত তৃপ্ত হবে তারপর কয়েক চাঁদ এলো গেল জুরাইজের এসব কিছুই জানা নেই তাকে নিয়ে কত গভীর ষড়যন্ত্র হতে যাচ্ছে দেখতে দেখতে সেই কালো দিনটি এসে হাজির হলো জুরাইজ তার ইবাদতখানায় ইবাদতরত ছিল হঠাৎ বাহিরে ব্যাপক সরগোল এরই মধ্যে কজন ক্ষিপ্র গতিতে তার ঝুপড়িতে প্রবেশ করল জুরাইস কিছু
বুঝে ওঠার আগেই কালিগালাচ এবং চট থাপ্পড়ের অনল বর্ষণ শুরু হলো সে দেখল কিছু লোক তার জরাজীর্ণ ইবাদত ঘরটির উপর হামলে পড়েছে খুঁটিগুলো উপড়ে ফেলছে কেউ কেউ কেউ বা আগুন ধরিয়ে সব পুড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায় মত্ত জুরাইজ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে এছাড়া আর কি করার আছে তার উপস্থিত লোকদের মধ্যে হতে একজন সামনে তেড়ে আসলো একেবারে জুরাইজের সামনে বুক টান করে দাঁড়ালো বলল কি বৈরাগী আর কতদিন নিজের আসল চেহারা আড়াল করে রাখবে এ বাচ্চা যে তোমার অবৈধ লীলার ফসল তা ইতিমধ্যেই জানাজানি হয়ে গেছে জোরাজের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো কবে কিভাবে কি ইত্যাদি এক ঝাঁকা অজানা প্রশ্ন তার
দেহমন জুড়ে আছড়ে পড়লো এরই মধ্যে ভিড় ঠেলে সামনে হাজির হলো সেই কাল নাগিনী সে রাতের প্রতিশোধ নিতেই এত আয়োজন চোখে মুখে তার বিজয়ের হাসি জুরাইজের এমন চুনকালি মাখা চেহারা খুব স্বাদ নিয়ে উপভোগ করছে সে ঠোঁটের কিনারায় একটু দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল কি জুরাইজ মনে নেই ওই যে সেই রাতে তুমি আমার সাথে যা করেছিলে এতো সেই রাতেরই ফসল তোমারই সন্তান জুরাইজের বুঝতে বাকি থাকলো না যে সে কঠিন এক ষড়যন্ত্রের শিকার সে তার চারপাশ দেখছে আজকে তার পক্ষ সমর্থনকারী কেউ নেই যেন আকাশ বাতাস সব আজকে ওর বিপক্ষে কিন্তু একজন তো আছে যার সাথে জোরাইজের রাত্র দিন কেটেছে
এই একাকি বিজন জঙ্গলে তিনি তো আর তাকে একা ফিরে যেতে পারেন না আজকে তিনি জুরাইজের একমাত্র ভরসা কেবল তিনিই পারেন তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে উপস্থিত সকলের চোখগুলি জুরাইজের উত্তরের অপেক্ষায় তার প্রতি নিবিষ্ট নীরবতায় ছেয়ে গেছে চারপাশ সে ধীর পদে হেঁটে বাচ্চার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো মায়া ভরা চোখে এক নজর শিশুটিকে দেখল আর স্নেহ ভরা হাত বুলিয়ে দিল তার নিষ্পাপ শিওরে তারপর উঠে এসে সকলের মাঝে দাঁড়ালো অযু করল তারপর পুরাতন ছেড়ে মুসল্লাটি বিছিয়ে দুই রাকাত নামাজের তাহরিমা বাঁধলো নামাজী ব্যক্তি তার প্রভুর সাথে কথা বলে কথাটির বাস্তব চিত্র যেন জুরাইজের এই দুই রাকাত নামাজে স্পষ্ট হয়ে
গেল স্থিরতা নিমগ্নতা আর শান্ত ভাব নেই কোন ব্যস্ততা বা অস্থিরতা সালাম ফিরে প্রশান্ত চিত্তে আবার বাচ্চাটির কাছে আসলো চেহারায় সামান্য চিন্তার লেশ মাত্র নেই যেন তার কিছুই হয়নি জুরাইজ বাচ্চার পেটে মৃদু আঘাত করল আর তাকে উদ্দেশ্য করে বলল বল তোমার বাবাকে উপস্থিত সবাই তো হতবাক আরে এ বাচ্চার কাছে এ প্রশ্ন কেন সে কি কথা বলতে পারে নাকি এছাড়া এ ছোট বাচ্চা তার বাবার কথা জানবেই বা কিভাবে তাদের ভাবনার রেশনা কাটতেই হঠাৎ শিশুটির অষ্টাধর কেঁপে উঠলো সে কিছু বলতে চাচ্ছে সবার চোখগুলো বড় বড় হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে কান সজাগ করে তার মুখনিশৃত শব্দমালার প্রতি নিবিষ্ট হলো
সবাই এমন সময় বাচ্চাটি বলে উঠলো আমার বাবা অমুক রাখাল নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে কষ্ট হচ্ছে অনেকের আমি যা শুনলাম সবাই কি তাই শুনেছে আসলেই কি শিশুটি কথা বলেছে বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই সবাই জুরাইজের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো আলিঙ্গন করে বুকে টেনে নিল শ্রদ্ধা ভরে তার কপাল চুমুতে লাগলো অনেকেই বলল আমাদের মাফ করে দাও আমরা তোমার ইবাদতখানাটি ভেঙে দিয়েছি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি কথা দিচ্ছি আমরা স্বর্ণ দিয়ে তোমার ইবাদত ঘর নতুন করে বানিয়ে দিব জুরাইজ বলল স্বর্ণ দিয়ে বানানোর প্রয়োজন নেই তোমরা আমাকে আমার পূর্বের ঝুপড়ি ফিরিয়ে দাও ডালপাতার ঘরই আমার সই অগত্যা লোকেরা তাই করল এভাবেই মহান আল্লাহ
তাকে এই মহাবিপদ থেকে মুক্ত করলেন সহিহ বুখারীর 3436 নম্বর হাদিস অবলম্বনে