[মিউজিক] সময়টা 1840 বিখ্যাত স্কটিশ অভিযাত্রী ডেভিড লিভিংস্টোন আফ্রিকার পথে পথে ঘুরছেন বাহ্যত তিনি একজন রোমাঞ্চপ্রিয় অভিযাত্রী আর দশটা অভিযাত্রীর মতই কিন্তু আদতে তার মিশন ছিল আফ্রিকা মহাদেশের একটি মানচিত্র তৈরি করার এরপর 50 ও 60 এর দশকে অভিযাত্রী রিচার্ড বার্জন জনস পিক ও জেমস গ্রান্ট উত্তর আফ্রিকা চষে বেড়ান এবং শেষ পর্যন্ত নীল নদের উৎস খুঁজে বের করতেও সক্ষম হন এদিকে 1830 এর দশকেই ফ্রান্স বর্তমান আলজেরিয়ার কিছু অংশ দখল করে নিয়ে কলোনি স্থাপন করেছিল এরও আগের শতাব্দীতে অর্থাৎ 1795 সালে ব্রিটেন দখল করে নিয়েছিল কেইপ কলোনি যা বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার একটি শহর কলোনিতে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত হয় 1814
সালে অন্যদিকে অ্যাঙ্গোলা ছিল পর্তুগিজ কলোনি ইউরোপিয়ানরা যদিও আফ্রিকার এসব ভূখণ্ডে নিজেদের বজায় রেখেছিল কিন্তু এগুলো ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র প্রধানত উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতেই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণ আফ্রিকান বিস্তৃত ভূমির ভেতর ইউরোপিয়ানরা প্রবেশ করতে পারছিল না কারণ অঞ্চলটি ছিল তাদের অজ্ঞাত পথ চেনা নেই আর তাদের হয়ে পথ চিনিয়ে দেয়ার এবং আফ্রিকার বিস্তৃত মানচিত্র অংকনের দায়িত্বটা পালন করে দেন পূর্বে উল্লেখিত ইতিহাসের এসব মহান অভিযাত্রীরাই ফলে একদিকে আফ্রিকার মানচিত্র চলে আসে ইউরোপীয়দের হাতে অপরদিকে সমসাময়িক আরো কিছু ঘটনা 1880 এর দশকে আফ্রিকার ভাগ্য পরিবর্তন করে দেয় পরবর্তী প্রায় 80 90 বছরের জন্য তাদের ভাগ্যে নেমে আসে ঔপনিবেশিক শাসন যুদ্ধ প্রতারণা আর মৃত্যু
আফ্রিকা দখলের জন্য ইউরোপীয়দের মাঝে তৈরি হয় উন্মাদনা ইতিহাসে যা স্ক্রাম্বল ফর আফ্রিকা বা আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতা হিসেবে খ্যাত আন্তপান্তর আজকের পর্বে জানার চেষ্টা করব কেন ইউরোপীয়রা আফ্রিকাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটওয়ারা করে নেয়ার উন্মাদনে মেতেছিল আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতার পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল তার মধ্যে প্রথমটা আমরা ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছি পর্যটন শিল্পের উত্থান যার মাধ্যমে ইউরোপীয়দের হাতে আফ্রিকার মানচিত্র চলে আসে দ্বিতীয়ত সে সময় ইউরোপের শিল্পায়ন পূর্ণ যৌগ না শিল্পায়নকে সচল রাখতে তাদের বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের দরকার ছিল ওদিকে আফ্রিকা ছিল তামা রাবার চা ও টিনের সমৃদ্ধ খনিতে ভরপুর ফলে কাঁচামালের সন্ধানে থাকা ইউরোপীয়দের জন্য
আফ্রিকা লোভনীয় গন্তব্যে পরিণত হয় তৃতীয় কার্যকরণ ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ততদিনে স্টিম ইঞ্জিনের জাহাজ আর রেল আবিষ্কৃত হয়ে যায় এতদিন যে আফ্রিকা ছিল দুর্গম দুর্ভেদ্য আধুনিক যানবাহনের কল্যাণে ততদিনে তা গম্য ও ভেদ হয়ে যায় এছাড়াও আফ্রিকায় ইউরোপিয়ানদের দুটি প্রাকৃতিক শত্রু ছিল একটি হলো ম্যালোরিয়া অপরটি ইয়েলো ফিভার বা হোলদে আফ্রিকার ক্রান্তি অঞ্চলের এসব রোগ শোক মেরু অঞ্চলের ইউরোপিয়ানদের গায়ে সইত না কিন্তু ইতিহাসের এই সময়টাতে গিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও প্রভুত উন্নয়ন ঘটে আবিষ্কৃত হয় কুইন নাইন যা ইউরোপীয়দের ম্যালেরিয়া আর হলদে জ্বরের প্রতিকার হিসেবে আবির্ভূত হয় সর্বশেষ ধাক্কাটা আসে ইউরোপের অর্থনৈতিক খাত থেকে 1873 থেকে 1896 পর্যন্ত ইউরোপ দীর্ঘমেয়াদী
অর্থনৈতিক মন্দা আক্রান্ত হয়েছিল ফলে শিল্প কারখানায় প্রস্তুতকৃত বিপুল পরিমাণ পণ্য ভোগ করার সামর্থ্য ইউরোপীয় বাজারগুলোর ছিল না ফলে প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় নতুন বাজারের তাদের ঝোঁকে পড়ে আফ্রিকার বিশাল বিস্তৃত সমৃদ্ধ জনপদের উপর 1869 সালে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটে ফ্রান্স ও মিশরের উদ্যোগে সুয়েজ খাল উদ্বোধন হয় এর ফলে ভূমধ্য সাগরের সাথে পারস্য উপসাগরের সংযোগ ঘটে এতে ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় নৌ চলাচল পথ অনেক সংক্ষিপ্ত এবং সহজ হয়ে যায় মিশর ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো সহসাই ইউরোপীয়দের লোভনীয় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় 1881 সালে ব্রিটেন মিশর দখল করে নেয় একই বছর ফ্রান্স দখল করে নেয় তিউনিশিয়া উভয় দেশ আফ্রিকার এক
প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত পুরোটা নিজেদের কলোনি বানাতে ব্যাগ্রত ছিল আর তাদের সংখ্যাতে উত্তাল হয়ে ওঠে আফ্রিকা বেলজিয়াম ছিল ইউরোপের অপরা রাজ্যগুলোর তুলনায় বেশ ছোট এর তৎকালীন রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের মনেও সে সময় সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সম্রাট বিখ্যাত অভিযাত্রী হেনরি মর্টন স্ট্যানলিকে গোপনে কঙ্গ নদীর অববাহিকা অঞ্চলে পাঠান সম্রাটের নির্দেশে 1879 থেকে 84 পর্যন্ত আফ্রিকার ওই অঞ্চলের গোত্রপ্রধানদের কাছ থেকে প্রচুর জমি কেনা হয় 1882 সালে সম্রাটের ক্রয়কৃত জমির পরিমাণ ছিল 2 লাখ 30 হাজার বর্গ কিলোমিটার বেলজিয়াম রাষ্ট্রের পরিবর্তে এটি সম্রাট দ্বিতীয় লিউপোল্টের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় দ্যা
ফ্রি কঙ্গো স্টেট ওদিকে ইউরোপে আরেকটি ঘটনা ঘটে যায় 1870 সালে বর্তমান জার্মানি দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্বে জার্মান জাতিগোষ্ঠীর লোকজন ক্রুশিয়া সহ একাধিক রাষ্ট্রে ছড়ানো ছিড়ানো ছিল অজভন বিসমার্ক তা একত্র করেন তো সদ্য প্রতিষ্ঠিত জার্মানির জন্য ইউরোপে দখল করার মতো কোন অংশ বাকি ছিল না তাই এ দেশটিও দৃষ্টি দেয় আফ্রিকার দিকে কিন্তু সেখানেও জার্মানি ছিল লেট ক্যামার বা পরে আসা তারপরও 1884 সাল নাগাত চোগোল্যান্ড এবং ক্যামেরুন সহ অনেক অঞ্চল জার্মানির দখলে চলে যায় ফলে আফ্রিকা দখলকে কেন্দ্র করে ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের মাঝে শুরু হয় স্বার্থের সংঘাত ফলে শান্তিপূর্ণভাবে আফ্রিকা দখল ও শাসন করার উদ্দেশ্যে বার্লিনে এক সম্মেলন আহ্বান
করা হয় 1884 থেকে 85 সালে অনুষ্ঠিত বার্লিন কনফারেন্সে ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যগুলো আফ্রিকা কিভাবে দখল করবে কোন নীতি মেনে চলবে তা নির্ধারিত হয় সিদ্ধান্ত হয় কঙ্গো নদী নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং ফ্রি কঙ্গো স্টেটে বেলজিয়ামের অধিকার স্বীকার করে নেয়া হয় 1889 সালে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ও দখলদার সিসিল রোডস ব্রিটিশ সাউথ আফ্রিকা কোম্পানি গঠন করেন উদ্দেশ্য ছিল আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে বাণিজ্যের নামে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করায় ঠিক যেমন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামে ভারত দখল করা হয়েছিল পরের বছর স্থানীয়দের সাথে প্রতারণামূলক চুক্তি ও আরো অন্যান্য উপায়ে আফ্রিকার বিশাল অংশে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন সিসেলস বর্তমান জাম্বিয়া এবং জিম্বাবুয়ে
অঞ্চলটির নামকরণই করা হয়েছিল তার নামে সে সময় দেশ দুটির নামকরণ করা হয়েছিল উত্তর রোড এশিয়া এবং দক্ষিণ রোডেশিয়া এভাবে 20 শতকের সূচনা লগ্নে আফ্রিকার লাইব্রেরি আর ইথিওপিয়া বাদে বলতে গেলে আফ্রিকার পুরো ভূখণ্ডই ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের দখলে চলে যায় এবং আফ্রিকা দখলে তাদের প্রতিযোগিতায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ত্বরান্বিত করেছিল এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেও 1935 সালে ইতালি ইথিওপিয়ার কিছু অংশে উপনিবেশ স্থাপনের ফলে সৃষ্ট যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল 1945 সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর ইউরোপিয়ান দেশগুলো দুর্বল হয়ে যায় যার প্রভাব পড়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত উপনিবেশ গুলোতেও সর্বত্র স্বাধীনতার দাবি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠতে শুরু করে সংগ্রাম ও বহুঘাত
প্রতিঘাতের পর বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতার ফুল ফুটতে শুরু করে যা আফ্রিকায়ও পাপড়ি মেলেছিল আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম স্বাধীন হয় সুদান 1956 সালে ব্রিটিশ ইজিপশিয়ান যৌথ উপনিবেশ থেকে দেশটি স্বাধীনতা পায় পরের বছর স্বাধীন হয় খানা 1960 সালকে বলা হয় ইয়ার অফ আফ্রিকা এ বছর ক্যামেরুন সেনেগাল মাদাগাস্কার ও মালি সহ বহু আফ্রিকান দেশ স্বাধীনতা লাভ করে জিম্বাবুয়ে ও জাম্বিয়ার স্বাধীনতা আসে 1980 এর দশকে দীর্ঘ কঠিন সংগ্রামের পর আনুষ্ঠানিক উপনিবেশের সমাপ্তি ঘটলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদাদের বর্ণবাদী শাসন ব্যবস্থা কিন্তু রয়ে যায় 1990 এর দশকে ধীরে ধীরে নেলসন ম্যান্ডেলার হাত ধরে দেশটি মুক্তির সাথে পায় 1994 সালে নির্বাচনে নেলসন ম্যান্ডেলার বিজয়
আফ্রিকায় স্ক্রাম্বল ফর আফ্রিকা যুগের সমাপ্তি ঘটিয়েছিল [মিউজিক]