আজকে ইসলামের ইতিহাসের এমন একজন মহান ব্যক্তি সম্পর্কে আমরা আলোচনা করতে চলেছি যাকে মহান আল্লাহ তাআলা সারা বিশ্বের বাদশা বানিয়েছিলেন যিনি চিরজীবন বেঁচে থাকার জন্য আবে হায়াতের সন্ধানে গিয়েছিলেন একদিন বাদশাহ জুলকারনাইন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে কোন এক অজানা পথ ধরে কোথাও যাচ্ছিলেন যেতে যেতে তিনি অনেক কথাই ভাবছিলেন কিছুক্ষণ যাবার পর বাদশাহ জুলকারনাইন ক্লান্ত হয়ে পড়লেন তাই তিনি কোন এক জায়গায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মনে মনে ভাবছিলেন কিভাবে সারা দুনিয়ায় ইসলাম ধর্ম প্রচার করা যায় কিভাবে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে আল্লাহর তৌহিদের বাণী ছড়িয়ে দেওয়া যায় এদিকে আসমানের এক ফেরেশতার সাথে জুলকারনাইনের মাঝে মাঝে কথাবার্তা হতো এমন সময় হঠাৎ করে আসমানের
সেই ফেরেশতা বাদশাহ জুলকারনাইনের কাছে হাজির হলেন সালাম দিয়ে বললেন হে বাদশাহ জুলকারনাইন এত গভীরভাবে কি ভাবছেন তখন বাদশাহ জুলকারনাইন বললেন আমি সারাজীবন আল্লাহর এবাদত করতে চাই এবং ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে চাই কিন্তু একদিন তো মৃত্যু হবেই তারপর ইসলাম ধর্ম কিভাবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে আচ্ছা বলুন তো আল্লাহর ফেরেশতা কিরূপ এবাদত করে একথা শুনে ফেরেশতাটি বলল আসমানের ফেরেশতারা যে এবাদতই করে কিয়ামত পর্যন্ত সেটি করতেই থাকবে যদি কোন ফেরেশতা রুকুতে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত সে রুকুতেই দাঁড়িয়ে থাকবে আবার কোন ফেরেশতা যদি সেজদায় থাকে তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত সে সেজদাতেই থাকবে এই কথা শুনে বাদশাহ জুলকারনাইন বলল আল্লাহ
রাব্বুল আলামীন যদি আমাকে কেয়ামত পর্যন্ত হায়াত দান করতেন তাহলে আমিও কেয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর এবাদতে মগ্ন থাকতাম কিন্তু এটা কি সম্ভব তখন ফেরেশতাটি বলল আমি আসমানের উপরে কোন একদিন শুনেছিলাম পৃথিবীর শেষ প্রান্তে কোহেকাব পর্বতের পাদদেশে একটি অন্ধকার গুহার মধ্যে আবে হায়াত নামক একটি কুয়ার পানি রয়েছে এটি পান করলে অমৃত্ব পাওয়া যায় সে সারাজীবন বেঁচে থাকবে এই কথা শুনে বাদশাহ জুলকারনাইন আশ্চর্য হয়ে গেলেন অতঃপর ফেরেশতাটি সালাম গ্রহণ করে বিদায় নিলেন এবার বাদশাহ জুলকারনাইন চিন্তা করতে করতে রাজ দরবারের দিকে ফিরে আসতে লাগলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বাদশাহ জুলকারনাইনকে সারা পৃথিবীর বাদশা বানিয়েছিলেন তিনি পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে ভ্রমণ করেছিলেন
পরের দিন বাদশাহ জুলকারনাইন রাজদরবারে একটি জরুরির মিটিং এর আয়োজন করলেন বাদশাহ জুলকারনাইনের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন খিজির আলাইহিস সাল্লাম আর ছিলেন আল্লাহর প্রিয় লোকমান হাকিম আরো ছিলেন জ্ঞানীগুণী আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ দরবেশ বাদশাহ জুলকারনাইন তখন সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন আবে হায়াতের পানি সম্পর্কে আপনারা কি কেউ কিছু জানেন তাহলে বলুন উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে একজন বিশেষজ্ঞ বললেন হুজুর আমি হযরত আদম আলাইহিস সালামের এক নসিহতনামা পাঠ করে দেখলাম তিনি বলেন আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীতে আবে হায়াত নামক এক সুস্বাদু সাদা তরল পদার্থ প্রেরণ করেছেন যা মানুষ একবার খেতে পারলে কিয়ামত পর্যন্ত তার আর মৃত্যু হবে না তবে আবে হায়াতের অন্ধকারের গভীরতা
অনেক সেখানে যেতে হলে দামি কোন মনিমুক্তা পাথর নিয়ে যেতে হবে নয়তো পথ হারানোর সম্ভাবনা আছে অপরদিকে থাকা অন্য একজন বলল আমিও শুনেছি আবে হায়াতের পানি দুধের চেয়েও সাদা মধুর চেয়েও মিষ্টি এই পানি পান করলে কেয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকা যাবে এটি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে কোহেকাব পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত তখন বাদশাহ জুলকারনাইন বলল আমার রাজত্বের ক্ষমতা ও দায়িত্ব আপনাদের এর কাছে দিয়ে আমি আবে হায়াতের সন্ধানে যেতে চাই অতঃপর বাদশাহ জুলকারনাইন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির নিকট রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে 12 বছরের জন্য আবে হায়াতের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নেন হযরত খিজির আলাইহিস সাল্লামকে কাফেলার প্রধান নিযুক্ত করেন অন্ধকার দেশে আলোর
প্রয়োজন তাই বাদশাহ জুলকারনাইন রাজকোষ থেকে দুইটি উজ্জ্বল মানিক নিয়ে একটি খিজির আলাইহিস সাল্লামকে দিয়ে দিলেন এবং আরেকটি নিজে রেখে দিলেন অতঃপর খিজির আলাইহিস সাল্লাম তার সৈন্যসহ প্রয়োজনীয় খাবার নিয়ে আবে হায়াতের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন বাদশাহ জুলকারনাইন প্রথমে পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তের দিকে যাত্রা করলেন যেতে যেতে তারা অনেক ধরনের আজব এবং নতুন অনেক প্রাণী দেখতে পেলেন তখন জুলকারনাইন সেখানে থামলো এবং সৈন্যদের জিজ্ঞেস করলেন আপনারা কি বলতে পারবেন এটা কোন প্রাণী সৈন্যরা বলল হুজুর এই ধরনের প্রাণী সম্পর্কে আমাদের পূর্বে কোন ধারণা ছিল না অতএব এটিও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সৃষ্টির এক প্রাণী যেতে যেতে তারা যখন এক নদীর অবস্থিত হলেন
সেখানে উপস্থিত হয়ে তারা দেখলেন নদীতে এক ধরনের মানুষ বসবাস করছে যাদের সম্মুখ মানুষের ন্যায় আবার পিছন মাছের ন্যায় এমনকি তারা নদীর নিচেও বসবাস করে তারা কখনো কথা বলে না এবং মানুষের সাথে চলাফেরা করে না এটি দেখে জুলকারনাইন সৈন্যদের বললেন আপনারা কি এই ধরনের মানুষজাতি পূর্বে কোনদিন দেখেছেন তখন সৈন্যরা বলল হুজুর দেখা তো দূরের কথা এমন মানুষজাতির কথা আমরা পূর্বে কোনদিনও শুনিনি এবার বলল যাও তাদের দুজনকে ধরে আনো সৈন্যরা বলল হুজুর তাদের ধরে কি করব জুলকারনাইন বলল পরীক্ষা করে দেখা হবে আসলে তারা সত্যি কি মানুষ না অন্য কোন প্রাণী জুলকারনাইনের কথা মতো সৈন্যরা তাদের কাছে গেল
কিন্তু তারা কোন প্রতিবাদ করল না চুপচাপ ওখানেই বসেছিল এবার সৈন্যরা তাদের দুজনকে ধরে আনলো তারপর অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর দেখল তারা আসলে মানুষের কোন গুণাবলী নয় আসলেই এরা একটি মৎস জাতি তাই তাদের কিছু না বলেই পুনরায় নদীতে ছেড়ে দিলেন অতঃপর সময় বিলম্ব না করে জুলকারনাইন ও তার সৈন্যরা সামনে এগোতে লাগলো কিছুদূর পর একটি স্থানে প্রবেশ করল সেখানে গিয়ে তার একটি আজব মনুষ্য জাতি দেখতে পেল তারা পশুন্যায় চারপায়ে হাঁটে এবং তারা পাল বেঁধে জঙ্গলের গুহার ভেতরে বসবাস করে জুলকারনাইন ও তার সৈন্যদের দেখে তারা এদিকে ওদিকে পালাতে লাগলো তখন জুলকারনাইন তার সৈন্যদের বলল এগুলো কোন ধরনের মানুষ
জাতি এদের নাম কি জানেন সৈন্যরা বলল হুজুর জানিনা জুলকারনাইন বলল আপনারা তো এর আগে অনেক গভীর জঙ্গল দিয়ে যাত্রা করেছেন তখন কি এমন মানুষ জাতি দেখেছেন সৈন্যরা বলল হুজুর এমন জাতি দেখা তো দূরের কথা এর পূর্বে এমন মানুষ জাতির কথা কারো মুখে শুনিনি তখন জুলকারনাইন বলল যাও তাদের মধ্য হতে কোন একজনকে ধরে আনো সৈন্যরা বলল হুজুর তারা তো আমাদের দেখে ভয়ে পালাচ্ছে তাহলে ধরে এনে কি করে করবো জুলকারনাইন বলল তাদের আবারো পরীক্ষা করে দেখা হবে তারা আসলে কি মানুষজাতি অতএব সৈন্যরা যখন তাদের কাছে গেল তারা সবাই ভয়ে ভীত হয়ে গোয়ার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে সৈন্যরা তাদের
মধ্য থেকে একজনকে ধরে আনলো এবং পরীক্ষা করে দেখল তাদের আকৃতি মানুষের নেয় কিন্তু তাদের কোন বুদ্ধি নাই তারা খুব ভীতু এবং অন্য কোন জাতিকে দেখে তারা জঙ্গলের গুহার মধ্যে পালাতে ব্যস্ত হয় অতঃপর বাদশাহ জুলকারনাইন সেখানে সময় বিলম্ব না করে সম্মুখে অগ্রসর হলেন পুনরায় এক পথ ধরলো যেতে যেতে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছালো পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে এসে এমন এক সম্প্রদায়কে দেখল যারা তার কথা কিছুই বুঝতে পারছিল না তবে আকার ইঙ্গিতে বাদশাহ জুলকারনাইন তাদের কথা বোঝার চেষ্টা করল এবং তারা বলল হুজুর আপনার মত ন্যায় সৎ বাদশা আমাদের মাঝে উপস্থিত হওয়ায় আমরা গর্বিত তারা বলল হে জুলকারনাইন ইয়াজুস
মাজুস নামের মানুষরূপী দৈত্যের এক সম্প্রদায় এই জমিনে খুবই অশান্তি সৃষ্টি করেছে তারা যখন বার হয় তাদের ভয়ে সবাই ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিতে হয় তারা সবকিছু ক্ষতি করে দেয় এমনকি খাদ্য পশু সবকিছু খেয়ে শেষ করে দেয় তাদের সংখ্যা এত বেশি যে তাদের সাথে আমরা যুদ্ধ করতে পারি না তাদের থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন অতএব হে জুলকারনাইন আমরা কি চাঁদা করে আপনাকে কিছু অর্থ দেব যাতে আপনি তাদের মাঝে একটি বড় প্রাচীর করে দিতে পারেন তখন জুলকারনাইন বলল আল্লাহতালা আমাকে যে পরিমাণ অর্থ ও ক্ষমতা দিয়েছেন তাই যথেষ্ট অতঃপর আপনারা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য করুন আমি তোমাদের এবং
ইয়াজুস মাজুজের মাঝে একটি প্রাচীর তৈরি করে দেব অতঃপর বাদশাহ জুলকারনাইন তাদের চরিত্র এবং কার্য সম্পর্কে জানতে চাইলেন তখন তারা বলল কতগুলো আছে লম্বা মানুষের মত জিহ্বাটা বিশাল বড় আবার কারো কারো মানুষের ন্যায় শরীর পশুর মত চেহারা তাদের বিশাল লম্বা দুটি কান আছে আবার কারো দুটি সিং আছে তবে অনেক মনীষীগণ এবং তাফসীরকারক ইয়াজুস মাজুস সম্পর্কে এক এক বর্ণনা দিয়েছেন অতঃপর এই কথা শোনার পর জুলকারনাইন বলল তোমরা আমার নিকট লোহার পাত সংগ্রহ করে আনো অতঃপর পরের দিন সৈন্যরা মাটি খুরে লোহা ও তামা সংগ্রহ করতে লাগলো যখন উভয় পর্বতের মধ্যবর্তী স্থান লোহা দ্বারা পূরণ করা হলো তখন জুলকারনাইন
বললেন তোমরা চুলায় আগুন ধরাও এবং লোহায় তাপ দিতে থাকো যখন লোহা উত্তাপ্ত হয়ে গলে যাবে তখন গলিত তামা নিয়ে এসে তাতে ঢেলে দেবে এইভাবে এখানে একটি বিশাল বড় প্রাচীর নির্মাণ করা হলো এরপর থেকে ইয়াজুস মাজুস তারা কখনোই এই পাঁচিল ভেদ করে আসতে পারেনি তিনি এই কাজ সমাধান করার পর বললেন এটা আমার আল্লাহর অনুগ্রহ বাদশাহ জুলকারনাইনের এমন ক্ষমতা দেখে সেখানকার লোকেরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন কেয়ামত পর্যন্ত তারা ইয়াজুস মাজুজের অত্যাচার থেকে নিরাপদ থাকবে বলে হাদিস থেকে উল্লেখ পাওয়া যায় হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত এক হাদিসে উল্লেখ আছে ইয়াজুস ও মাজুস এই প্রাচীর ভেদ করার
জন্য প্রতিদিন ভোর থেকে তারা জিহ্বা দ্বারা এই প্রাচীর চেটে চেটে পাতলা করে ফেলে সন্ধ্যার প্রায় কাছাকাছি সময় মনে করে বাকিটুকু কালকে চেটে শেষ করে মুক্ত পৃথিবীতে বের হয়ে যাব এই কথা ভেবে অলসভাবে ঘুমিয়ে পড়ে অতঃপর ভোরবেলা তারা যখন আবার ওই প্রাচীরের কাছে আসে তখন দেখে এই প্রাচীর আবারো পূর্ণ হয়ে গেছে তবে এভাবেই প্রতিদিন তারা এই প্রাচীর চেটে পৃথিবীতে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে তবে তাদের খবর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই ভালো জানেন অতঃপর তারা উত্তর দিকে রওনা হলেন সেখানে গিয়ে তারা দেখলেন এক বিশাল প্রাচীর ঘেরা বড় এলাকা এই প্রাচীরের ও প্রান্তে কি আছে সেটা দেখার জন্য সৈন্যদের নিয়ে
জুলকারনাইন এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করলেন কিন্তু কোথাও কোন দরজা পেলেন না অবশেষে সৈন্যের মধ্যে থেকে একজনকে ওই প্রাচীরের ওপর দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করালেন কথা ছিল ওই লোকটি দেয়ালের ভিতর থেকে ঘুরে এসে সেখানকার সমস্ত খবরাখবর জানাবে কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিক্রম হয়ে গেল সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছিল যে লোকটি ফিরে আসবে কিন্তু লোকটি আর ফিরে এলো না এবার জুলকারনাইন আরেকজনকে দেয়ালের উপরে তুলে দিল সে যেন দেয়ালের উপর থেকে দেখে ওই প্রান্তের সমস্ত খবর দেয় কিছুক্ষণ পর ওই লোকটিও দেয়ালের উপর থেকেই অদৃশ্য হয়ে গেল দীর্ঘ সময় অতিক্রম করার পর সে লোকটিও ফিরে এলো না তখন জুলকারনাইন ভাবলেন সেখানে কোন
রহস্যময় গজবী জাতির অস্তিত্ব রয়েছে আর কোন লোককে হারাবে না বলে জুলকারনাইন আর সামনে এগলো না অতঃপর সেখানে সময় বিলম্ব না করে তারা আবারো পূর্ব দিকে রওনা হলেন এরপর কিছুদূর গিয়ে তারা দেখল একটি সুন্দর শহর সেখানকার মানুষজন শিক্ষিত এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে খুবই উন্নত কিন্তু তাদের ভাষা বোঝা খুবই কঠিন ছিল বাদশাহ জুলকারনাইন কে দেখে তারা সালাম গ্রহণ করলে তারা বলল হে জুলকারনাইন আপনি এখানে আসায় আমরা খুবই খুশি হলাম তখন বাদশাহ জুলকারনাইন তাদেরকে কলেমার দাওয়াত দিলেন আল্লাহ এক আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই এই কথাটি তারা এক বাক্যে কবুল করে নিল তারা ছিল বুদ্ধিমান জাতি তাই তারা সময় বিলম্ব না
করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল এবং তাদেরকে যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধা করল এবং দীর্ঘদিন তাদের মাঝে থেকে তাদের ভাষা শিখে নিল সেই শহরের একটি লোকও তার সামান্যতম বিরোধিতা করেনি জুলকারনাইনের হেদায়েতের জিন্দেগীর মধ্যে এত সহজে আর কোন জাতিকে তিনি হেদায়েত করাতে পারেননি যখন সেখানে আর একটিও লোক ঈমান গ্রহণে বাকি ছিল না তখন তিনি সেখান থেকে পূর্ব দিকে যাত্রা করেন জুলকারনাইন কিছুদিন পর অতিক্রম করার পরে আবারো তিনি এক সমুদ্রের তীরে এসে পৌঁছালেন সেখান থেকে সামনে যাবার জন্য কোন ব্যবস্থা পেলেন না তাই তিনি আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগোতে লাগলেন তখন সৈন্যরা বলল হুজুর সমুদ্রের ওই কিনারায় একটি সুন্দর শহর
দেখা যাচ্ছে জুলকারনাইন সেখানে যাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে কিন্তু সৈন্যরা বলল হুজুর ওখানে যাবার জন্য সমুদ্র পার হতে হবে কিন্তু এখানে তো কোন নৌকা বা কিছুই ব্যবস্থা নেই জুলকারনাইন তখন ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলেন তার ভয়ে সেখানকার লোক সবকিছু লুকিয়ে রেখেছে অতঃপর জুলকারনাইন সৈন্যদের বলল যাও তোমরা জঙ্গল থেকে কিছু গাছ কেটে ওই গাছের গুঁড়ি নিয়ে আসো এবং সেটা দিয়েই ভেলা বানাও তাতে করেই ওই কিনারায় পৌঁছে যাব জুলকারনাইনের কথা মতো সৈন্যরা জঙ্গলে গেল কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে এমন কিছু গাছ পেল যার গুঁড়ি জলে ডোবে না এবার সৈন্যরা একে একে ওই গাছের গুঁড়িগুলি নিয়ে এলো সব সৈন্যরা মিলে
খুব দ্রুতভাবে অনেকগুলি ভেলা তৈরি করল এবার এক এক করে ওই ভেলায় চড়ে সমুদ্র পাড়ি দিল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যখন তারা ওই শহরে পৌঁছালো তখন দেখল ওই শহরের মানুষ খুবই দুর্বল এবং কৃষ্ণকাই যখন জুলকারনাইন তাদেরকে জিজ্ঞেস করল আপনারা এত দুর্বল কেন তারা বলল আমাদের এখানে সম্পদ যথেষ্ট রয়েছে সম্পদের কোন অভাব নাই কিন্তু খাদ্যের খুবই অভাব আমরা রেশন পদ্ধতিতে খাদ্য পেয়ে থাকি এই কথা বলে তারা জুলকারনাইনকে সম্মান প্রদান করল সেখানে থাকা একদল মানুষ বহু মূল্যবান পাথর হীরা মুক্তা মানি এনে জুলকারনাইনকে উপহার হিসেবে দিলেন এখানকার মানুষের নরম মেজাজ ও ভদ্রতা দেখে জুলকারনাইন খুবই খুশি হলেন এবং তাদের মাঝে
কলেমার দাওয়াত দিলেন একে একে শহরে সকলেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন এভাবেই বহুদিন ধরে পথ চলতে চলতে তারা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর একেবারে পূর্ব দেশে এসে পৌঁছালেন আরো অগ্রসর হয়ে ককেশাস পর্বত এলাকায় পৌঁছে তারা পথ হারিয়ে ফেললেন সকলেই সহপাঠী থেকে আলাদা হয়ে পড়লেন দীর্ঘ এক বছর ধরে তারা একে অপরের থেকে আলাদা হয়েই ঘুরলেন মাঝেমধ্যে তারা মিলিত হয়েছে আবারো পথ হারিয়ে ফেলেছে এমন সময় খিজির আলাইহিস সাল্লাম অন্যরকম অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় দেখে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যান তিনি যতই সামনে এগিয়ে যায় তত গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যায় তখন তিনি নিজের কাছে থাকা সেই উজ্জ্বল মানিক বের করে তার আলোতে সামনে এগোতে
থাকে তিনি আরো সামনে এগিয়ে গিয়ে এক শ্বাস রুদ্ধকার স্থানে পৌঁছে একটি কূপ দেখতে পান কূপের কাছে গিয়ে তিনি কূপের পানির যে রং দেখলেন তিনি এটি আবে হায়াত বলে ধারণা করলেন তখন তিনি দুই হাত ভরে পানি উঠিয়ে পানি পান করলেন মধুর চেয়ে মিষ্টি দুধের চেয়েও সাদা এবং মেশকের চেয়েও অধিক ছিল তার সুগন্ধি তিনি ওখানে পেট ভরে আবে হায়াতের পানি পান করলেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন তাতে খিজির আলাইহিস সাল্লামের কয়েকদিনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা দূরীভূত হলো শরীরের নতুন শক্তির সঞ্চয় হলো এবং চেহারা উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করল অতঃপর তিনি জুলকারনাইনকে পানি পান করাবে বলে আশা করে পিছনের দিকে
রওনা হলেন হযরত খিদির আলাইহিস সাল্লাম যেখানে পৌঁছাতে অনেকদিন হেঁটেছিলেন সেখান থেকে বের হতে তার 10 ভাগের এক ভাগ সময়ও লাগেনি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে জুলকার নাইন কে খুঁজতে লাগলো দীর্ঘ সময় পর কয়েকজন সৈন্যের সাথে তার দেখা হলো তারা খিজির আলাইহিস সাল্লামকে দেখে চিনতে পারলো না তখন সৈন্যরা বলল আপনি কে আর এই অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকায় কি করছেন খিজির আলাইহিস সাল্লাম কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন তারপর বললেন আমি খিজির আলাইহিস সাল্লাম অন্যরা বলল আপনাকে তো চিনতেই পারলাম না আপনার চেহারার এমন পরিবর্তন হলো কিভাবে তখন খিজির আলাইহিস সাল্লাম বললেন আমি আবে হায়াতের পানি পান করেছি আসলেই আবে
হায়াতের পানি পান করার পর হযরত খিজির আলাইহিস সাল্লামের চেহারার এমন উজ্জ্বল হলো যাতে পূর্বের চেহারার সাথে কোন মিল ছিল না তাই সৈন্যদের সাথে কথা বলে তার পরিচয় দিতে হয়েছে খিজির আলাইহিস সাল্লাম সৈন্যদের কাছে বললেন জুলকারনাইন কোথায় আছে তারা বললেন তিনি এক বছর পূর্বে তাদের থেকে আলাদা হয়ে কোথায় গিয়ে গিয়েছেন তার কোন খবর তাদের জানা নেই এদিকে জুলকারনাইন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বহুপথ ঘুরে ঘুরে এক অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করলেন অনেক ভিতরে প্রবেশ করে জুলকারনাইন একটি বিরাট অট্টলিকা দেখতে পান আস্তে আস্তে তিনি অট্টলিকার কাছে গিয়ে দেখেন দরজায় বিশাল বড় আকারের একটা মোরগ তারা মানুষের মত কথা বলতে পারে জুলকারনাইন
কে দেখা মাত্রই মোরগ বলল হে পৃথিবীর আদিবাসী বাদশাহ জুলকারনাইন আপনি কি জন্য এখানে এসেছেন তখন জুলকারনাইন বলল আমি আবে হায়াতের পানির খোঁজে এখানে এসেছি যদি আবে হায়াত পেতাম তাহলে আবে হায়াতের পানি পান করে সারাজীবন বেঁচে থাকতে পারতাম জুলকারনাইনের কথা শুনে মোরক হাসতে হাসতে বলল আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনাকে যে বিশাল রাজ্য এবং অফুরন্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ দান করেছেন তাতে আপনার মন ভরলো না এখন আপনি পৃথিবীতে কেয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চান এতটা লোভে পড়া আপনার উচিত হবে না কারণ পৃথিবীর বয়স শেষ এখন গানবাজনার প্রচলন হয়েছে পুরুষেরা নারীর বেশ ধারণ করবে এবং নারীরা পুরুষের বেশ ধারণ করে তাছাড়া মানুষ বড়
বড় ইমারাত তৈরি করে দুনিয়ার আয়েশ আরামে বিভর হয়ে থাকবে আল্লাহর স্মরণ মানুষের মধ্যে থাকবে না দিন দিন মানুষ অর্ধপতনের দিকে অগ্রসর হবে এই সময় আপনার কেয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার সার্থকতা কোথায় এই কথা বলে তারা পালকগুলো ঝাপটাতে লাগলো তখন অট্টলিকা গুলো মনিমুক্তা জহরত হীরে পান্না নামক বহু মূল্যবান পাথরে পরিপূর্ণ হয়ে গেল তখন মোরগ জিজ্ঞেস করল আপনি কি এইসব নিতে চান তখন জুলকারনাইন বললেন না আমি এইসব চাই না অতঃপর মোরগ বলল তবে আপনি সামনের দিকে এগিয়ে যান আরো কিছু জানতে পারবে তখন জুলকারনাইন মোরগের কথা মতো সামনের দিকে এগিয়ে গেল সামনের দিকে কিছুদূর গিয়ে দেখলেন ইসরাফিল ফেরেশতার ন্যায়
একজন বিরাট বড় সিঙ্গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে কোনদিক তাকাচ্ছে না শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে জুলকারনাইন সেখানে পৌঁছে ইসরাফিল ফেরেশতাকে সালাম দিলেন অতঃপর ইসরাফিল ফেরেশতা তাকে বলে হে জুলকারনাইন তুমি কি উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছো জুলকারনাইন বললেন আমি আবে হায়াতের পানি অনুসন্ধান করছি আমি আবে হায়াতের পানি পান করে কেয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চাই তখন ইসরাফিল ফেরেশতা জুলকারনাইনের কথা শুনে বলল তোমার এই লোভ না করাই উত্তম দীর্ঘ হায়াত দীর্ঘ হায়াত লাভ করে কেউ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হয়নি অতএব সোজা নিজের বাড়িতে ফিরে যাও এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে হায়াত দিয়েছেন তার শুকরিয়া আদায় করো
মনে রেখো এই সময়ের মধ্যে যেন বেকার মুহূর্ত না কাটে এই কথা বলার পর জুলকারনাইনকে এক টুকরো পাথর দিল এবং বলল এই পাথর দ্বারা আমার কথাগুলো পরীক্ষা করো অতঃপর জুলকারনাইন পাথর নিয়ে অন্ধকার এলাকা থেকে আলোর দেশে রওনা হলেন প্রতিমধ্যেই মাটির উজ্জ্বল রং ধারণ করল তার বিশিষ্ট সঙ্গী লোকমান হাকিমের নিকট জিজ্ঞেস করলেন এটি এভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে কেন তখন লোকমান হাকিম বলল এটা মাটি নয় এখানে মুক্তা জহরত ইয়াকুত ও ফিরোজা নামক মহামূল্যবান পাথরের স্তুূপ আপনার প্রয়োজন হলে নিতে পারেন তখন জুলকারনাইন সেখান থেকে কিছু পাথর নিয়ে নিলেন দীর্ঘ সময় পরে তারা অন্ধকার থেকে আলোর দেশে এসে পৌঁছালেন তখন
দেখলেন পথের কুড়ানো পাথরগুলো বাস্তবে কি অমূল্য পাথর আর ইসরাফিল ফেরেশতা দেওয়া পাথরটি একটি বিড়ালের মাথার আকৃতির সাদা পাথর এই পাথর সম্পর্কে জুলকারনাইন লোকমান হাকিমের কাছে জিজ্ঞেস করলেন এটি তাকে দেওয়ার কারণ কি তখন লোকমান হাকিম বলল এই পাথর তাকে দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো আপনাকে পৃথিবীর সবকিছুর লোভ পরিত্যাগ করা আপনি এই পাথর পাল্লায় মেপে দেখুন পৃথিবীর কোন কিছুর ওজন পাবেন না একমাত্র পাল্লায় মাটি ভর্তি করলে তার ওজনটা সঠিক পাবেন এর অর্থ হলো পৃথিবীর সবকিছুর মূল্য বাস্তবতা বেকার এবং একমাত্র মাটি বাস্তবতাই সঠিক অতএব মানুষের মাটির শরীর একদিন মাটিতেই মিশে যাবে অট্টলিকা পেশা টাকা-পয়সা খাট পলঙ্ক ধনদৌলত কোন কিছুই সঠিক
নয় অতএব সেই মাটিতেই চিরদিন থাকার জন্য প্রত্যেককে প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন এই কথা শুনে জুলকারনাইন তার কাছে থাকার সমস্ত সোনা রুপা হীরে মুক্ত মানিক টাকা-পয়সা ধন দৌলত উপস্থিত লোকের মাঝে বিলিয়ে দিলেন এবং বললেন তোমরা দেশে চলে যাও আমি এই পাহাড়ের পাদদেশে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবো এই কথা বলে সকলকে বিদায় করলেন এবং তার মায়ের নিকট একখানি পত্র লিখে জানিয়ে দিলেন তার পুত্রের জন্য তিনি সবসময় যেন দোয়া করেন তিনি কিয়ামতের দিন তার সাথে সাক্ষাৎ করবেন অতঃপর জুলকারনাইনের মা তার পত্র পেয়ে কাঁদলেন এবং যতদিন তিনি পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন তার ছেলের জন্য দোয়া করতেন জুলকারনাইন পাহাড়ের পাদদেশে বসে আল্লাহর এবাদত
করতেন এভাবে বেশ কয়েক বছর অতিবাহিত হবার পরে তিনি সেখানেই ইন্তেকাল করেন অতএব প্রিয় দর্শক আমাদের সকলকে একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে তাই দুনিয়ার সব সুখ স্বাচ্ছন্দ সবকিছুই আসলে বেকার আমরা সকলে সমস্ত খারাপ কাজ বর্জন করে সহজ সরল রাস্তায় চালিত হই এবং মৃত্যুর সময় আমরা সকলেই যেন কলেমা পড়তে পড়তে মৃত্যুবরণ করতে পারি মহান আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সকলকে এই তৌফিক দান করুক আমিন