রুমেল রিক্সায় উঠবে। এলাকার মানুষ দেখলে কি বলবে? >> না কিছুতেই না। আমি একজন জজ। রিক্সায় উঠলে লোকে কি ভাববে? এই নোংরা রুটি এখানে খাচ্ছ কেন? ফেলে দাও। >> স্যার আমি আপনাগো আমার রিক্সায় নিতে পারবো না। >> বন্ধুরা আজকে আমি আপনাদের কাছে এমন একটা গল্প বলতে বসেছি যেটা হয়তো শুনতে শুনতে আপনার চোখ ভিজে যাবে। হয়তো মনে পড়ে যাবে আপনার নিজের বাবার কথা। অথবা মনে পড়বে সেই মানুষের কথা যে মানুষ নিজে না খেয়ে আপনাকে খাইয়েছে। নিজে কষ্ট করে আপনাকে বড় করেছে। এই গল্পটা একজন গরীব বাবার গল্প। যিনি রিক্সা চালিয়ে নিজের ছেলেকে জজ বানিয়েছেন। একজন বোনের গল্প যে
নিজের সংসার বিসর্জন দিয়ে ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে। আরেকজন ছেলের গল্প। যে অনেক বড় হয়ে গেছে কিন্তু বড় হতে গিয়ে ভুলে গেছে কার হাতের কষ্টের পানিতে সে এতদূর পৌঁছেছে এই গল্প আমাদের অনেকের জীবনের আয়না তো বন্ধুরা চলুন শুরু করি ঘটনার শুরু একটা সাধারণ সকালে রুমেল সাহেব পুরো নাম রুমেল হোসেন এই শহরের একজন দায়েরা জজ বয়স মাত্র 32 সবচেয়ে কম বয়সে জজ হওয়ার গৌরব তার ঝুলিতে পত্রিকায় তার ছবি থাপা হয়েছিল তরুণ মেধাবী বিচারপতি এই শিরোনামে সেই পত্রিকার কাটিং আজও তার অফিসের দেওয়ালে ঝোলানো। রুমেল সাহেবের জীবনটা দেখতে যদি যান মনে হবে সবকিছু ঠিকঠাক। বড় বাড়ি, সরকারি গাড়ি, ড্রাইভার,
শিক্ষিত স্ত্রী, শ্বশুরবাড়ির মানুষজন ভালো। এক কথায় জীবনে কোন অভাব নেই। কিন্তু কিছু কিছু অভাব থাকে। যেটা চোখে দেখা যায় না। সেটা হলো মনের ভেতরে থাকা অহংকারের অভাব। মানবতার অভাব। সেই সকালে রুমেল সাহেব একটা অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। তিনি সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। ড্রাইভার সকালবেলায় গাড়ি প্রস্তুত করে রেখেছিল। রুমেল সাহেব স্ত্রীকে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। গ্লাস তুলে দিলেন। এসি চালু। চুলে হাত বুলিয়ে পোশাক ঠিক করলেন। একজন জর্জ সাহেবের মতনই। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি চলছিল। হঠাৎ গাড়িটা ধীর হয়ে গেল। ইঞ্জিনে একটা অদ্ভুত শব্দ। তারপর একদম বন্ধ। রাস্তার মাঝখানে ড্রাইভার বলল স্যার গাড়ি মনে হয় ডিস্টার্ব করতেছে রুমেল সাহেবের
মুখ মুহূর্তে কালো হয়ে গেল কি গাড়ি নষ্ট হয়েছে সকালবেলা গ্যারেজ থেকে বের করার সময় সব চেক করোনি কেন ড্রাইভার বলল স্যার সব চেক করেই বের করেছিলাম কিন্তু রুমেল সাহেব শুনলেন না তিনি বললেন তুই ছুটি চেয়েছিলি আমি দিইনি তাই ইচ্ছে করে গাড়ি নষ্ট করেছিস তাই না বন্ধুরা একটু ভাবুন একজন মানুষ যে সারাদিন অপরাধ আর ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করেন তিনি নিজেই প্রমাণ ছাড়া একজন নিরীহ ড্রাইভারকে দোষী বানিয়ে দিচ্ছেন। এটা কি ন্যায়বিচার? রুমেলের স্ত্রী বললেন, আরে তুমি একটু মাথা ঠান্ডা করো। গাড়িতে সমস্যা হতেই পারে। ওর দোষ কোথায়? কিন্তু রুমেল সাহেব থামলেন না। বললেন, তুমি যেটা বোঝো না সেটা
নিয়ে নাক গলাকাইসো না। নিজের স্ত্রীকেও থামিয়ে দিলেন। ড্রাইভারকে বললেন, এই মাসটা শেষ করে তুই বিদায় নিবি। এরপর স্ত্রীর পরামর্শে রাস্তায় রিক্সা ধরলেন। রিকশায় উঠতে উঠতে বললেন, একজন জজ রিকশায় উঠবে এলাকার মানুষ দেখলে কি বলবে? মুখে অসন্তোষ, মনে অহংকার ভেতরে একটা ক্ষোভ জমতে লাগলো। রিক্সাওয়ালা একজন বৃদ্ধ মানুষ। বয়স হয়তো 65, চুলে পাক ধরেছে। হাতের চামড়া রোদে পুড়ে শক্ত হয়ে গেছে। পায়ে পুরনো চড়ি, গায়ে একটা ময়লা সাদা পাঞ্জাবি। কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। সেই বৃদ্ধ রিকশাওয়ালার নাম আলম সাহেব। রুমেল সাহেব রিকক্সায় উঠতে যাবেন। বৃদ্ধ মানুষটা স্বভাবসুলভভাবে একটু হাত ধরে সাহায্য করতে গেলেন। ব্যাস এটুকুই যথেষ্ট ছিল
রুমেল সাহেবের রাগ উপচে পড়ার জন্য। কত বড় সাহস নোংরা হাতে আমাকে ধরছেন? আমি কে জানেন আপনি? আমি এই শহরের জজ। আলম সাহেব কিছু বললেন না। চুপচাপ থাকলেন। রিক্সায় বসে তিনি একটা রুটি খাচ্ছিলেন। সকালের খাবার। কাজে বেরনোর আগে হয়তো ঘরে কিছু ছিল না। তাই এই একটুকু নিয়েই বেরিয়েছিলেন। রুমেল সাহেব সেই রুটিটা দেখে বললেন, এই নোংরা মুটি এখানে খাচ্ছ কেন? ফেলে দাও। এবং নিজেই সেই রুটিটা কেড়ে মাটিতে ছুড়ে দিলেন। বন্ধুরা একজন বৃদ্ধ মানুষের হাতের খাবার কেড়ে নেওয়া। এর চেয়ে নিষ্ঠুর আর কি হতে পারে? কিন্তু রুমেল সাহেব একবারও ভাবলেন না। আলম সাহেব তখনো কিছু বললেন না। শুধু বললেন,
স্যার আমি আপনাগো আমার রিকক্সায় নিতে পারবো না। অন্য রিকশায় যান। রুমেল সাহেব রাগে ফেটে পড়লেন। কত বড় বেয়াদব আমি জর্জ আর তুমি আমাকে রিকক্সায় নেবে না? এই রিকক্সাসহ তোমাকে জেলের ভাত খাওয়াবো। শেষ পর্যন্ত রিকক্সায় উঠলেন। গন্তব্যে পৌঁছে 20 টাকার ভাড়ায় 100 টাকা দিয়ে চলে গেলেন। মনে করলেন বড় মনের পরিচয় দিলেন। অনুষ্ঠানস্থল ছিল শহরের একটা পার্কে। রুমেল সাহেব পৌঁছলেন প্রধান অতিথির আসনে বসলেন বাতাস খেলেন চা খেলেন। কিন্তু মেজাজ তখনো ঠিক হয়নি। এই পার্কেই ঘুরতে এসেছিল তার পুরনো বন্ধু মাহফুজ। চেয়ারম্যানের ছেলে। লেখাপড়া করেনি বিশেষ। কিন্তু মানুষের সাথে মেশার একটা স্বভাব আছে তার। মাহফুজ রুমেলকে দেখে আনন্দে ডাকল।
আরে রুমেল কত বছর পর দেখা। রুমেলও খুশি হলো। পুরনো বন্ধু। দোলনায় বসলো দুজনে। মাহফুজ বলল ভাই তুই তো ইতিহাস কইরা ফালাইছিস সবচেয়ে কম বয়সে জর্জ পত্রিকায় দেখছিলাম কি লিখেছে জানোস রিক্সাওয়ালার ঘর থেকে জর্জের জন্ম রুমেলের মুখের হাসি মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল তাড়াতাড়ি বলল আরে ওটা ভুল করে লিখেছে আমাদের বাড়ির পাশে একটা রিক্সার গ্যারেজ ছিল মাহফুজ কিছু বুঝলো না কিন্তু রুমেলের স্ত্রী পাশ থেকে একটু অবাক হয়ে তাকালো মাহফুজ বলল যাই হোক ভাই কোন মামলা মোকদ্দমা হলে আমাকে কে বলিস এখন তো তুই দায়রা জজ রুমেল হেসে বলল মাথায় রাখলাম মাহফুজ একটু মজা করে বলল আমি তো মূর্খ
মানুষ লেখাপড়া করিনি কিন্তু মানুষের সাথে মিশতে পারি এই এলাকার প্রতিটা মানুষকে চিনি কিন্তু তোর মত জজ সে আমার এলাকার মানুষের সাথে কতটুকু মিশতে পারে বলতো রুমেল একটু চুপ থাকলো মাহফুজ একটু তীণভাবে বলল তোর বাপ এখনো রিক্সা চালায় শুনলাম সে কেমন আছে রুমেল কিছু বলল না চোখ অন্যদিকে সরিয়ে নিল। সন্ধে হয়ে গেছে। আলম সাহেব রিকক্সা চালিয়ে সারাদিন কাটিয়ে বাড়িতে ফিরলেন। ছোট্ট একটা ঘর, মাটির দেওয়াল, টিনের চাল, উঠনে একটা তুলসী গাছ। মেয়ে রাতের রান্না করছিল। আলম সাহেব ঘরে ঢুকলেন। হাতে ধরা 100 টাকার একটা নোট। মেয়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দেখলো, বাপ কাঁদছেন। আব্বা কি হয়েছে? টাকা পাইয়া
কাঁদো কেন? এর আগে তো বহুবার এরকম 100 200 টাকা পাইছো। আজকে এমন কি হইলো? আলম সাহেব কাঁপা কন্ঠে বললেন, জানোস মা আজগা রুমেল আমার রিকক্সায় উঠছিল বউ নিয়া। মেয়ে যেন পাথর হয়ে গেল। কি কইলা আব্বা? হ মা রুমেল আজগা আমার হেক্সায় উঠছে। আমারে চিনে নাই। আমার হাতের রুটি কাইড়া মাটিতে ফালায়ে দিছে। দুনিয়ার অপমান করছে। তারপর 100 টাকা দিয়া চইলা গেছে। সুমির বয়স 25। কিন্তু তার চোখে তার বয়সের চেয়ে অনেক বেশি বয়সের ছাপ। সুমির রাগে কাঁপতে লাগলো। মা পাশ থেকে বললেন, ওর বউ নিয়ে উঠেছে সেটা তো আমার কোন দুঃখ নাই। কিন্তু তুমি এই অপমান সহ্য কইরা
আইলা। এই ছেলেরে জজ বানাতে তুমি কত কষ্ট করছো। আর সে তোমার হাতের খাবার মাটিতে ছুড়ে মারছে। আলম সাহেব চোখ মুছলেন। বললেন, আমি কিছু বলি নাই। ছেলে তো আর এখন সে বড় মানুষ। সুমি বলল, আব্বা, এই কথা আর বলবা না। সে বড় মানুষ হইছে ঠিকই। কিন্তু তোমার পরিচয় অস্বীকার করার অধিকার তারে কে দিছে? তোমার হাতের খাবার মাটিতে ফালানোর অধিকার কে দিছে? মা বললেন, সুমি তুই শান্ত হ। ছেলে মানুষ করতে গিয়া অনেক কিছু মাইনা নিছি। এটাও মাইনা নেই। সুমি চিৎকার করে উঠলো। আর না মা আর না আর কতটুকু মাইনা নেব। দেওয়ালে পিঠ ঠেকা গেছে। এইবার জবাব দিতে
হইব। বন্ধুরা এই সুমির কথা একটু বলা দরকার। সুমি শুধু রুমেলের বোন না সে রুমেলের জীবনের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য স্তম্ভ। রুমেলের বাপ রিক্সা চালাতেন। সামান্য আয় তার মধ্যে সংসার চালানো, রুমেলের পড়াশোনার খরচ সব মেলানো কঠিন ছিল। সুমি তখন বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়িতে ছিল। ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ যোগাতে সে কি করেনি? স্বামীর ইনকামের টাকা থেকে সংসার খরচ কমিয়ে সে ভাইকে টাকা পাঠাতো। চাল বিক্রি করে টাকা পাঠাতো। কখনো কখনো পাড়াপরশীর কাছে কাজ করে স্বামীকে জানাতো না লুকিয়ে করতো। কারণ একটাই ভাইয়ের স্বপ্নটা যেন ভেঙে না যায়। একদিন ধরা পড়ে গেল। শ্বশুরবাড়ির মানুষ জানতে পারল সুমি বাপের বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছে সংসারের
টাকা। স্বামী রাগ করল। শ্বশুর রাগ করল। এক কথায় ডিভোর্স। ছোট্ট একটা মেয়ে সন্তান নিয়ে সুমি বাপের বাড়িতে ফিরে এল। সেই মুহূর্তেও সে কাঁদেনি। ভেবেছিল ভাই একদিন বড় হবে সব ঠিক হয়ে যাবে। রুমেল যেদিন জর্জ হলো সেদিন সুমির সারারাত কেঁদেছিল আনন্দে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন টিকলো না। রুমেল জজ হওয়ার পরে শ্বশুরবাড়ির মেয়ে বিয়ে করল। বড় বাড়িতে উঠলো সরকারি গাড়ি পেল আর বাপ-বোনকে ভুলে গেল। কখনো ফোন করেনি, কখনো দেখতে আসেনি। এমনকি শ্বশুরবাড়িতে নিজের পরিচয় দিয়েছে বাবা-মা বিদেশে থাকেন কোটিপতি। নিজের বাপকে অস্বীকার করেছে। এই ছিল রুমেলের আসল চেহারা। এদিকে রুমেল সাহেব বাড়ি ফিরলেন। স্ত্রী লক্ষ্য করলেন মুখ বেজার।
শ্বশুর জিজ্ঞেস করলেন, কি হলো জামাইবাজি? মুখ এমন কেন? রুমেল বললেন, আর বলবেন না। সকালে গাড়ি নষ্ট। ড্রাইভারটা আমাকে রাস্তায় নামিয়ে দিল। রিক্সায় উঠতে হলো। এক নোংরা রিক্সাওয়ালার নোংরা হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরল। মেজাজটাই গেল। শ্বশুর বললেন, আরে তুমি ঘরে গিয়ে এসিতে বসো। মাথা ঠান্ডা হবে। কিন্তু স্ত্রী রুমেলকে একটু আলাদা করে নিয়ে বলল, একটা কথা বলি। সেই রিক্সাওয়ালাকে কেন এভাবে বললে? মানুষ তো। রুমেল হেসে বলল, তুমি বুঝবে না। একজন জজকে দেখে যদি ওরা ভয় না পায় তাহলে আমার মানসম্মান থাকবে কিভাবে? স্ত্রী চুপ করে গেল। কিন্তু মনে মনে কিছু একটা ভাবলো। রাতে মায়ের সাথে একলা কথা বলার সুযোগ
পেয়ে বলল, মা তুমি আমাকে কেমন মানুষের সাথে বিয়ে দিলে? সারাদিন কানের কাছে বকবক করে। গরিব মানুষ সহ্য করতে পারে না। রিক্সাওয়ালাকে মানুষ মনে করে না। মা বললেন, আরে এরকম বলিস না জর্জ মানুষ মাথায় কত চাপ থাকে। মেয়ে বলল, মা শিক্ষা মানুষকে বড় করে না। মানবতা বড় করে। অনেক শিক্ষিত মানুষ দেখেছি। কিন্তু এরকম কখনো দেখিনি। বন্ধুরা সেই রাতে আলম সাহেবের ঘরের কথায় ফিরে আসি। রাতের খাবার টেবিলে আলম সাহেব বসলেন। সুমি ভাত পরিবেশন করল। কিন্তু কেউ বিশেষ খেল না। আলম সাহেব বললেন জানো সুমি রুমেলের বউটা দেখতে ভালো শিক্ষিতও মনে হলো সুমি বলল আব্বা বউটার কথা বলতাছো আর
তোমার ছেলে তোমার হাতের খাবার মাটিতে ফেলে দিছে এইটা মনে নাই আলম সাহেব চুপ থাকলে তারপর আস্তে আস্তে বললেন মা আমি অনেকবার ভাবছি ছেলেকে জজ বানাইতে পারলাম কিন্তু মানুষ বানাইতে পারলাম না এইটা কি আমার ব্যর্থতা সুমি মায়ের দিকে তাকালো মা বললেন, আপনি কোন ব্যর্থ না। আপনি সাধ্যমত চেষ্টা করছেন। ছেলে ভুল পথে গেছে এটা আপনার দোষ না। আলম সাহেব বললেন, তবু মনে হয়তো ছোটবেলায় আরো কঠিন শাসন করা উচিত ছিল। হয়তো শিখিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। বাড়ির বড়দের সম্মান করতে গরীব মানুষকে মানুষ মনে করতে। সুমি বলল, আব্বা এইসব চিন্তা বাদ দাও। যা হওয়ার হয়েছে। এখন শুধু ভাবো পরের কাজটা
কি? রাত গভীর হল। সুমি শুতে পারলো না। ঘরের মধ্যে পায়চারি করল। মনের ভেতরে একটা ঝড় উঠেছে। সে ভাবল কতদিন সহ্য করব? বাপকে অপমান করার পরেও চুপ থাকবো? এটা কি মেনে নেওয়া উচিত? না। সকাল হতেই সুমি ঠিক করল। রুমেলের কাছে যাবে সরাসরি। কিন্তু ঠিকানা জানা নেই। বাপকে জিজ্ঞেস করল। বাপ বললেন, ঠিকানা জানিনা। তবে রিক্সা চালানোর সময় দেখা হলে জেনে নিতে পারব। সুমি ভাবল অন্য কোন পথ আছে কিনা। বের হলো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখা হলো মাহফুজের সাথে মাহফুজ সেই চেয়ারম্যানের ছেলে যে কম পড়েছে কিন্তু মানুষ চেনে মাহফুজ বলল আপা এত হন হন করে কোথায় যাচ্ছেন সুমি বলল
রুমেলের ঠিকানা জানো মাহফুজ একটু থামল তারপর বলল কেন কি হয়েছে সুমি সব বলল মাহফুজ শুনে বলল আপা আমার কাছে ওর ভিজিটিং কার্ড আছে ও নিজেই দিয়েছিল আমি অবশ্য ভাবছিলাম এটা দিয়ে কি করব আপনি রাখুন| ভিজিটিং কার্ড হাতে নিয়ে সুমির চোখ চকচক করে উঠলো। সুমি বাড়িতে ফিরল। বাপকে বলল, আব্বা ঠিকানা পেয়ে গেছি। চলো। আলম সাহেব মাথা নাড়লেন। না মা আমি আর অপমান নিতে যেতে চাই না। সুমি বলল, আব্বা এবার অপমান নিতে যাচ্ছি না। উচিত জবাব দিতে যাচ্ছি। আপনি না গেলে হবে না। কারণ আপনিই প্রমাণ। আপনাকেই সামনে থাকতে হবে। মা বললেন, সুমি সাবধানে কথা বলবি। রাগের মাথায়
কিছু করিস না। সুমি বলল, মা রাগ না সত্যি কথা বলব। শুধু সত্যি। আলম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। ঠিক আছে মা চল। রুমেলের বাড়ি শহরের ভালো এলাকায়। বড় দরজা। পাহারাদার আছে। সুমি আর আলম সাহেব দরজায় দাঁড়ালেন। দারোয়ান বলল, কে লাগবে? সুমি বলল, রুমেল সাহেবকে একটু ডেকে দিন। জরুরি কথা আছে। দারোয়ান একটু সন্দেহের চোখে দেখল। ভাবলো এরা আবার কোন মামলার লোক আসলো? ভেতরে গেল। রুমেলের শাশুড়িকে বলল। শাশুড়ি বেরিয়ে এলেন। সুমি বলল, একটু রুমেল সাহেবের সাথে দেখা করতে চাই। শাশুড়ি বললেন, উনি বাড়িতে আছেন কিন্তু কারণটা বলবেন? সুমি বলল, ব্যক্তিগত কথা আছে। একটু ডেকে দিন। শাশুড়ি ভেতরে ডাকলেন।
রুমেল বেরিয়ে এল। বের হয়ে দেখল দুজন মানুষ। একজন বৃদ্ধ, একজন মহিলা। বৃদ্ধকে দেখেই চিনল সেই রিক্সাওয়ালা। রুমেলের মুখে বিরক্তি এল। আবার এসেছো 100 টাকা কম হয়ে গেছে। যাও উপর থেকে 10000 টাকা নিয়ে আসো। গরীব মানুষের মুখে ছুড়ে দাও। সুমি এবার চুপ থাকলো না। সুমি এক ধাপে এগিয়ে এল। চোখে চোখ রেখে বলল, রুমেল ভাই, আপনি কি এই লোকটাকে চেনেন না? সত্যিই চেনেন না? এই বৃদ্ধ মানুষটার নাম আলম। আলম হোসেন। তিনি আপনার জন্মদাতা বাপ। হ্যাঁ। যে মানুষটাকে আপনি নোংরা রিক্সাওয়ালা বলে অপমান করলেন তিনিই আপনার বাপ। রুমেল একটু কেঁপে উঠলো কিন্তু মুখ শক্ত রাখার চেষ্টা করল। শাশুড়ি হতবাক
হয়ে দাঁড়িয়ে। সুমি থামলো না। জানেন এই বাপ কি করেছেন আপনার জন্য। এই মানুষটা সারাজীবন রিক্সা চালিয়েছেন রোদে বৃষ্টিতে। শীতে গরমে এই মানুষটার হাতের চামড়া দেখুন। রিক্সার প্যাডেল মারতে মারতে শক্ত হয়ে গেছে। এই মানুষটার পায়ের চটিই দেখুন কতটা পুরনো। এই মানুষটার গায়ের পাঞ্জাবি দেখুন কতটা খয়ে গেছে। এই মানুষটার শেষ সম্বল ছিল এক টুকরো জমি। সেটাও বেঁচে দিয়েছেন আপনার পড়াশোনার খরচ মেটাতে। এই মানুষটার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল ছেলে একদিন বড় হবে। সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াবে। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু ছেলে বড় হয়ে বাপকে ভুলে গেছে। রুমেলের শাশুড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। সুমি চলতে থাকলো। আর আমার
কথা বলব? আমি এই বাপের মেয়ে। আমি রুমেলের বোন আমার আরেকটা পরিচয় আছে আমি একজন ডিভোর্সি নারী কেন ডিভোর্স হয়েছে জানেন এই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ দিতে গিয়ে বাপ রিক্সা চালিয়ে যতটুকু আয় করতেন সেটা দিয়ে সংসার চলতো না আর ভাইয়ের পড়াশোনাও হতো না আমি স্বামীর ঘরে ছিলাম সংসার ছিল ছোট্ট একটা মেয়ে হয়েছিল কিন্তু ভাইয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল দেখে আমি চুপ থাকতে পারিনি স্বামীকে না জানিয়ে লুকিয়ে সংসারের চাল বিক্রি করে বাজার কম করে নিজে না খেয়ে ভাইয়ের হাতে টাকা তুলে দিয়েছি। সেটা ধরা পড়লে শ্বশুরবাড়ির মানুষ আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিল। আমি ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে এলাম।
মানুষের বাড়িতে কাজ করেছি। অনেক অপমান সহ্য করেছি। কিন্তু একটাই আশা ছিল। ভাই একদিন বড় হবে। সেই কষ্টের দিন শেষ হবে। সেই ভাই বড় হলো। জর্জ হলো। তারপর কি করলো? জর্জের জুতোর মতো আমাদের ছুড়ে দিল। নিজের বউকে বলল বাপ মা বিদেশে থাকেন কোটিপতি আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি এমনকি গতকাল নিজের বাপকে রিক্সায় চিনেও চেনেনি বাপের হাতের রুটি মাটিতে ফেলে দিয়েছে অপমান করেছে আর ভাড়া দিয়েছে 100 টাকা 100 টাকা যে বাপ ভিটে মাটি বেঁচে ছেলে জর্জ বানিয়েছে তার পাওনা 100 টাকা রুমেলের শাশুড়ি এতক্ষণে বুঝলেন চোখে পানি এসে গেছে তিনি রুমেলের দিকে ঘুরলেন বললেন এটা সত্যি তুমি আমাদের মিথ্যে বলেছিলে।
শাশুড়ি এবার বললেন, তুমি নামে বিচারপতি। তুমি প্রতিদিন কোর্টে যাও। মানুষের অপরাধ বিচার করো। সঠিক রায় দাও। কিন্তু নিজের পরিবারের সাথে এত বড় অবিচার করলে কিভাবে? আমরা তোমাকে এক কথায় আমাদের পরিবারে নিয়েছি। মেয়ে দিয়েছি, বিশ্বাস করেছি। তুমি আমাদেরও মিথ্যে বলেছ। তোমার বাবা কোটিপতি না। তিনি রিক্সাওয়ালা। সেটা কি লজ্জার? তোমার বাবা রিক্সা চালান এটা কি ছোট? আমি বলছি না এটা লজ্জার না ছোটও না। মানুষ তার কর্মে বড় হয়। এই মানুষটা সারাজীবন পরিশ্রম করে ছেলেকে বড় করেছেন। এর চেয়ে বড় কাজ আর কি আছে? কিন্তু তুমি তুমি নিজেই লজ্জিত হলে বাপের পরিচয়। এটা তোমার ছোটত্বের পরিচয়। আমাগরে বড় লোকের
বাচ্চা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছো। গরিব মানুষদের ঘরে আসতে দাও না কিন্তু সত্যি হচ্ছে তুমি নিজেই একটা গরীব মানুষের ছেলে আর সেই পরিচয়টাকে তুমি লুকিয়ে রেখেছো ছি রুমেল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রুমেল সাহেব এতক্ষণ চুপ ছিলেন কিন্তু এখন আর পারলেন না মাথার ভেতরে সবকিছু যেন ঘুরপাক খেতে লাগল বাপের কথা মনে পড়ল সেই ছোটবেলার কথা বাপ রিক্সা চালিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরতেন ক্লান্ত কিন্তু রুমেলের পড়াশোনার খোঁজ নিতেন বোনের কথা মনে পড়ল সুমি কিভাবে রাত জেগে তার পড়া বুঝিয়ে দিত। পরীক্ষার আগের রাতে সুমি কফি বানিয়ে দিত। আর সেই সুমি আজ একা ডিভোর্সি মানুষের বাড়িতে কাজ করছে। রুমেলের মুখ থেকে কথা
বের হলো না। চোখে জল এসে গেল। সে বাপের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। বলল আব্বা। আলম সাহেব চমকে উঠলেন। রুমেল বলল, আব্বা আমাকে মাফ কর। আমি অনেক বড় ভুল করেছি। তোমার পরিচয় লুকিয়েছি। তোমাকে চিনতে চাইনি। তোমার হাতের খাবার মাটিতে ফেলে দিয়েছি। আমি জানি এটা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু তুমি আমার বাপ। তুমি না মাফ করলে আমি কোথায় যাব? বোনরে তুমিও আমাকে মাফ কর। তুমি নিজের সংসার হারিয়েছো আমার জন্য। আমি কখনো সেই ঋণ শোধ করতে পারবো না। কিন্তু আজ থেকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। আর কোনদিন তোমাদের অস্বীকার করবো না। আলম সাহেব ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, বাবা
বাপ ছেলের অপরাধ মনে রাখে না। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। সুমি পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। রুমেল বোনের দিকে তাকালো। সুমি বলল, ভাই, তুই তোর ভুল বুঝতে পারছি সেটাই যথেষ্ট। আমি তোরে ক্ষমা করলাম। কিন্তু একটা শর্ত। রুমেল বলল, কি শর্ত? সুমি বলল এখন থেকে আব্বাকে নিজের কাছে রাখবি আমাকেও তোর বউকে সত্যি পরিচয় দিবি আর কোন মিথ্যে না রুমেল মাথা নাড়লো শাশুড়ি এগিয়ে এলেন আলম সাহেবের হাত ধরলেন বললেন আপনি আমার জামাইয়ের বাবা আপনি আমার বাড়িতে আসুন এই বাড়ি এখন থেকে আপনারও বন্ধুরা সেই রাতে রুমেল একলা ঘরে বসেছিল মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল সে প্রতিদিন কোর্টে যায় মানুষের বিচার করে
ধর্ষণের মামলা খুনের মামলা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রায় যায় কিন্তু নিজের ঘরের ভেতরে নিজের বাপের সাথে নিজের বোনের সাথে সে কত বড় অবিচার করেছে যে মানুষ নিজেই ন্যায়বিচার করতে পারে না নিজের পরিবারের প্রতি সে কিভাবে দেশের লাখো মানুষের ন্যায়বিচার করবে এই প্রশ্নটা তাকে সারারাত ঘুমাতে দিল না পরের দিন সকালে রুমেল অফিসে গেল কিন্তু সেদিন সে একটু অন্যরকম কোর্ট রুমে ঢোকার আগে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটু থামল বাপের কথা মনে করল সেই বাপ যে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে রিক্সা চালিয়ে তাকে এই জায়গায় এনেছেন। সেদিনের রায়গুলো ছিল একটু ভিন্ন আরো মানবিক আরো সংবেদনশীল। সেই ঘটনার পর থেকে রুমেলের জীবনে পরিবর্তন
এল। আলম সাহেব এসে রুমেলের বাড়িতে থাকতে লাগলেন। আর রিক্সা চালাতে হলো না তাকে। সুমিও এল ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে। শাশুড়ি সুমিকে নিজের মেয়ের মত করে নিলেন। রুমেলের স্ত্রী জানতে পেরেছিল সব সত্যি কথা। প্রথমে কষ্ট পেয়েছিল কিন্তু তারপর সে বুঝল একটা মানুষ যখন নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে সেটা দুর্বলতা না সেটা সাহসিকতা। রুমেলের স্ত্রী সুমিকে বলল, ভাবি আমি জানতাম না। কিন্তু এখন জানলাম। আপনি যা করেছেন ভাইয়ের জন্য এটা আমি কোনদিন ভুলবো না। সুমি হাসল। সেই হাসিতে অনেক কষ্টের পর একটুখানি শান্তি। বন্ধুরা এই গল্পটা শেষ হলো কিন্তু এই গল্পের কথা মনে থাকবে আমি আপনাদের কাছে কিছু প্রশ্ন রেখে
যেতে চাই আমরা যখন বড় হই পড়াশোনা করি ভালো চাকরি পাই সমাজে নাম হয় তখন কি আমরা কখনো পেছনে তাকাই যে মানুষটা না ঘুমিয়ে আমাদের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছে তার কথা মনে থাকে যে বাপ সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেও জিজ্ঞেস করতেন আজকে পড়া হয়েছে তার কথা মনে থাকে শিক্ষা মানুষকে কে বড় করে এটা সত্যি কিন্তু শিক্ষার সাথে যদি মানবতা না থাকে তাহলে সেই শিক্ষা কোন কাজে আসে না একটা রিক্সাওয়ালা বাপ মানেই ছোট না একজন গরীব মানুষ মানেই অপমানের পাত্র না বরং যে মানুষ নিজের শিকর ভুলে যায় নিজের জন্মদাতার পরিচয় দিতে লজ্জা পায় সেই আসলে সবচেয়ে
ছোট রুমেল অনেক বড় পদে ছিল কিন্তু সত্যিকারের বড় হলো সেদিন যেদিন সে বাপের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে বলতে পারল আব্বা মাফ মাফ করো। বন্ধুরা আপনার বাপ হয়তো রিক্সা চালান না কিন্তু তিনি যাই করুন তার হাতের পরিশ্রমের ফলেই আজকে আপনি এখানে। আজকে যদি তার সাথে ঠিকমত কথা না বলে থাকেন একটু ফোন করুন। আজকে যদি মায়ের সাথে ভালো আচরণ না করে থাকেন একটু কাছে যান। আজকে যদি বোন বা ভাইকে ভুলে গিয়ে থাকেন একটু মনে করুন। কারণ এই সম্পর্কগুলো একদিন শেষ হয়ে যাবে। আর যেদিন শেষ হবে সেদিন কোন টাকা পয়সা পদমর্যাদা কাজে আসবে না। শুধু অনুশোচনা থাকবে।
বন্ধুরা গল্পটা ভালো লাগলে এখনি লাইক দিন। আপনার কাছের মানুষদের সাথে শেয়ার করুন। হয়তো কেউ এই গল্প থেকে কিছু শিখতে পারবে। কমেন্টে জানান এই গল্পের কোন মুহূর্তটা আপনার বুকে সবচেয়ে বেশি লেগেছে। আর আমাদের চ্যানেলটি এখনো সাবস্ক্রাইব না করে থাকলে এখনই করুন। কারণ আমরা প্রতিদিন এমন অনুপ্রেরণামূলক গল্প নিয়ে আসি। ধন্যবাদ সবাইকে