এক খোদা হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতী রহমতুল্লাহ আলাইহি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তার কিছু শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে বর্তমান আজমের শরীফের এক স্থানে এসে উপস্থিত হলেন তিনি যে স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন সেই স্থানের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল একটি বিশাল বড় পুকুর পুকুরটির বিশালত্বের কারণে সেখানকার স্থানীয় হিন্দুরা পুকুরটিকে আনার সাগর বলে ডাকতো সেই পুকুরের চারপাশে ছিল অনেকগুলো মন্দির সেই সময়ের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা পুকুরটিকে অতি পবিত্র বলে মনে করতো এবং এটাকে খুব শ্রদ্ধা করতো তাদের মনে বিশ্বাস ছিল যে কোন পাপী ব্যক্তি যদি সেই পুকুরটিতে নেমে গোসল করে তাহলে তার সকল পাপ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যাবে এ কারণেই হিন্দুরা সবসময়
পুকুরের চারপাশ আলোকসজ্জার মাধ্যমে আলোকিত করে রাখতো বর্ণিত আছে পুকুরে এত পরিমাণ বাতি প্রজ্জ্বলিত করা হতো যে প্রতিদিন তিন মণ তেলের প্রয়োজন হতো পুকুরটিতে এত বেশি পবিত্র মনে করা হতো যে সেই পুকুরটিতে সকল হিন্দুরা স্পর্শ করতে পারতো না শুধুমাত্র উচ্চ পর্যায়ের ব্রাহ্মণরাই সেই পুকুরে গোসল করতে পারতো ও পানিকে স্পর্শ করতে পারতো তাদের বিশ্বাস ছিল ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কেউ স্পর্শ করলে সেই পুকুরের পানি অপবিত্র হয়ে যাবে খাজা মইনুদ্দিন চিশতী ও তার সাথীরা দীর্ঘ সফরের কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তাই তারা একটি গাছের নিচে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন কিছুক্ষণ পর যখন নামাজের সময় হলো তখন তিনি বখতিয়ার রহমতুল্লাহ আলাইহিকে
বললেন বখতিয়ার তুমি যাও নামাজের জন্য আযান দাও তিনি এমন আদেশ পেয়ে আযান দিতে শুরু করলেন হিন্দুস্থানের কোন মানুষ তখন পর্যন্ত তাওহীদের বাণী আযান শ্রবণ করেনি যখন তারা আযানের কথাগুলো শ্রবণ করল তখন তাদের মধ্যে এক চাঞ্চল্য শুরু হলো তারা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে একে অপরের সাথে বলাবলি করতে শুরু করল এই ফকিরগুলো কোথায় থেকে আসলো এবং তারা এগুলো কি করছে এদিকে আযান শেষ হওয়ার পর খাজা মইনুদ্দিন চিশতি রহমতুল্লাহ আলাইহি এবং তার সাথীরা মিলে সেই আনার সাগর নামক পুকুরে অযু করলেন হিন্দু ব্রাহ্মণেরা এমন দৃশ্য দেখে খুবই রাগান্বিত হলেন তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো একজন ব্রাহ্মণ বলতে লাগলো
এই ফকিরের দল কোথা থেকে আসলো এবং আমাদের এই পবিত্র পুকুরের পানিকে অপবিত্র করে দিল আমরা এই পুকুরকে কত পবিত্র বলে গণ্য করি তারা আমাদের কাছ থেকে একটু অনুমতি নেওয়ারও চেষ্টা করল না অবশ্যই এই অপরাধের জন্য তাদেরকে শাস্তি পেতে হবে তখন খাজা মইনুদ্দিন চিশতি রহমতুল্লাহ আলাইহি তার সকল সঙ্গীদেরকে নিয়ে নামাজ আদায়ের জন্য জামাতে দাঁড়িয়ে গেলেন চারদিকে লোকজন সেই নামাজের দৃশ্যগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল তারা একে অপরকে বলতে লাগলো এতো দেখছি আশ্চর্য এক ফকির উপাসনা করার জন্য যে দেব দেবী সবই তো আমাদের মন্দিরে রয়েছে মন্দিরে পূজা না করে সে বাইরে আবার কার উপাসনা করছে যদি মন্দিরের বাইরে কোন
খোদা থেকে থাকে তাহলে তো তাকেও মন্দিরের ভিতরে এনে প্রতিস্থাপন করা দরকার যাতে সব মানুষ তাকে চিনতে ও পূজা করতে পারে এভাবেই সন্ধ্যা ঘুনিয়ে আসলো লোকজন ও ব্রাহ্মণেরা তাদের নিজেদের গন্তব্যে চলে গেল তখন রাজা পৃথিবীরাজের উটের রাখালরা তার উটগুলোকে নিয়ে সেই স্থানে উপস্থিত হলো খাজা মইনুদ্দিন চিশতী রহমতুল্লাহ আলাইহি যে স্থানে উপস্থিত হয়েছিলেন সেই স্থানেই রাখালের উটগুলো থাকতো যখন রাখাল দেখতে পেল উটগুলোর স্থান দখল করে নেওয়া হয়েছে তখন সে বলতে লাগলো এই যে ফকির বাবা আপনি কি জানেন না এখানে রাজা পৃথিবীরাজের উটগুলো রাত্রিযাপন করে এই জায়গা দখল করার সাহস আপনি কোত্থেকে পেয়েছেন তখন তিনি উত্তর দিলেন দেখো
বাবা আমরা তো জানতাম না যে এখানে রাজার উটগুলো রাত্রি যাপন করে তাই না জেনে আমরা এই স্থান দখল করেছি যেহেতু আমরা এই স্থানে রাত্রি কাটানোর জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করে ফেলেছি তাই তুমি দয়া করে তোমার উটগুলো অন্য কোথাও নিয়ে বসাও এই জায়গাটি ছাড়াও চারদিকে তুমি আরো অনেক জায়গা পেয়ে যাবে তখন রাখাল রেগে গিয়ে বলতে লাগলো আপনার এত বড় দুঃসাহস রাজার উটগুলো আপনাদের জন্য অন্য জায়গায় যাবে আর আপনারা উটের জায়গায় অবস্থান করবেন এটা কোনভাবেই সম্ভব না তারা তাদেরকে এ স্থান থেকে উঠানোর জন্য প্রচন্ড দুর্ব্যবহার শুরু করল তখন খাজা মইনুদ্দিন চিশতি তার শিষ্য বখতিয়ার খাকি রহমতুল্লাহ আলাইহিকে বললেন
বখতিয়ার তারা যখন আমাদেরকে এখানে থাকতেই দেবে না তো চলো আমরা এই স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাই তখন বখতিয়ার বলল হুজুর অসময়ে আমরা কোথায় যাব তিনি উত্তর দিলেন বখতিয়ার চিন্তা করো না আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখো যাওয়ার আগে তিনি উটগুলোকে আদেশ করে বললেন তোমরা এই স্থানেই বসে থাকবে আমি পুনরায় আদেশ করার আগে এখান থেকে থেকে উঠবে না এই বলে তিনি তার সঙ্গীদের নিয়ে এ স্থান ত্যাগ করলেন পরের দিন সকালে যখন উটগুলো আবার নিয়ে যাওয়ার সময় হলো তখন রাখালেরা এসে দেখতে পেল রাতে উটগুলোকে যেভাবে বসে থাকতে দেখেছিল এখনো উটগুলো সেভাবেই বসে আছে তারা অনেকবার চেষ্টা করেও উটগুলোকে
বসা থেকে তুলতে পারছিল না রাখালদের মাঝে একজন লোক ছিলেন ধার্মিক প্রকৃতির সে অপরজনকে বলতে লাগলো আচ্ছা তুমি কি শুনতে পেয়েছিলে গত রাতে আমরা যে ফকিরকে এখান থেকে বিদায় করে দিয়েছিলাম সে যাওয়ার সময় বলে দিয়েছিল রাজার উটগুলো এখানেই বসা থাকবে আমার মনে হয় তিনি মস্ত বড় একজন জাদুকর ছিলেন হয়তো তার এই কথার জন্যই উটগুলো আজ উঠছে না সে বলল তুমি ঠিক বলেছো চলো আমরা এই কথাগুলো মহারাজকে জানাই তখন তারা রাজা পৃথিবীরাজের দরবারে হাজির হলো এবং রাজাকে বলতে লাগলো মহারাজ আমরা আজ উটগুলোকে শত চেষ্টার পরও উঠাতে পারছি না তখন রাজা জিজ্ঞেস করলেন কেন উটগুলোর কি কোন রোগ
ব্যাধি হয়েছে তখন তারা উত্তর দিল না মহারাজ আসলে গতকাল সন্ধ্যায় আমরা কয়েকজন ফকিরের সাথে দুর্ব্যবহার করেছি এবং তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম তারা আমাদের উট রাখার জায়গা দখল করে সেখানে রাত্রি কাটানোর ব্যবস্থা করেছিল তার জন্য যাওয়ার সময় সেই ফকিরটি বলে দিয়েছিল রাজার উটগুলো এখানেই বসা থাকবে আমার মনে হয় ফকিরের বদদোয়ার কারণেই আমাদের উটগুলো এমন অবস্থা হয়েছে তখন রাজা হুকুম দিলেন ঠিক আছে তোমরা যেখান থেকে পারো সেই ফকির বাবাকে আমার নিকট নিয়ে আসো তখন তারা বেরিয়ে পড়লো খাজা মইনুদ্দিন চিশতি রহমতুল্লাহ এর সন্ধানে খুঁজতে খুঁজতে একটা পর্যায়ে তারা হঠাৎ দেখতে পেল সেই পাগল বেশে ফকির বাবাকে তখন তারা তাকে
মহারাজের দরবারে হাজির করল তখন রাজা বিনয়ের সাথে বলতে লাগলো হে ফকির বাবা আপনি আমার উটগুলোর উপর কি জাদু করেছেন যে তারা এক জায়গা থেকে উঠতেই পারছে না এমন অবস্থা থাকলে তো আমার উটগুলো নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে না খেয়ে মারা যাবে আপনি কি চান এই অসহায় প্রাণীগুলো না খেয়ে মৃত্যুবরণ করুক দয়া করে আপনি আপনার জাদু ফিরিয়ে নিন তখন তিনি উত্তর দিলেন মহাশয় আমরা মুসলমান আর মুসলমান কোনদিন জাদু করে না আপনার উটগুলোকে আমি বসিয়ে রাখিনি বরং তাদেরকে বসিয়ে রেখেছে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার হুকুমে উটগুলো বসে আছে এবং তিনি হুকুম দিলেই উটগুলো আবার
উঠে দাঁড়াবে তবে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করে দেখতে পারি যাতে তিনি আপনার উটগুলোকে ওঠার অনুমতি দেন তারপর তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন হে আল্লাহ দয়া করে আপনি এই অসহায় প্রাণীগুলোকে ওঠার তৌফিক দান করুন তার এই দোয়া করার সাথে সাথেই রাখালরা দেখতে পেল তাদের উটগুলো এক স্থান থেকে উঠে চারণভূমির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে গেল এবং তার এই বুজুর্গের কথা সারা আজমির পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লো হিন্দুদের মাঝে যখন তার বুজুর্গের কথা ছড়িয়ে পড়লো এবং ইসলামের মাহাত্বের কথাও যখন তাদের সামনে প্রকাশিত হতে লাগলো তখন মন্দিরের ব্রাহ্মণরা ভীত হয়ে ভাবতে লাগলো এমন যদি
চলতে থাকে তাহলে তো সকল হিন্দুরা মুসলমান হয়ে যাবে তখন সকল ব্রাহ্মণেরা মিলে রাজা পৃথিবীরাজের কাছে গেল বলতে লাগলো মহারাজ এই ফকির আমাদের রাজ্যে এসে মানুষের মধ্যে এক বিভ্রান্তকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এরকম যদি চলতে থাকে তাহলে সকল হিন্দুরা মুসলমানে পরিণত হবে ফলে দেখা যাবে যে আমাদের মন্দিরে মূর্তিগুলোকে পূজা করার মতো কেউ থাকবে না আর একটা কথা সে তার সঙ্গীদের নিয়ে প্রতিদিন পাঁচবার করে আমাদের এই পবিত্র আনার সাগরে নামে সেই পানিতে হাত মুখ ধুয়ে পানিকে অপবিত্র করে আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই ফকিরকে এই রাজ্য থেকে বিতাড়িত করুন তাদের মুখে এমন অভিযোগ শুনে রাজা তাকে ডেকে পাঠালেন খাজা
মইনুদ্দিন উপস্থিত হলেন রাজার দরবারে তখন রাজা বললেন দেখুন ফকির বাবা আমি শুনতে পেয়েছি আপনি আমাদের গৌমাতার মাংস ভক্ষণ করেন এবং আমাদের মন্দিরের দেব দেবীদের নিয়ে বিভিন্ন উল্টাপাল্টা মন্তব্য করেন আবার আমাদের পুকুরের পানিকেও অপবিত্র করেন আমরা আপনার এই জুলুমকে সহ্য করবো না আপনি অতি সত্যর আমাদের এই রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে যান তখন তিনি উত্তর দিলেন বাবা আমরা ছাড়াও তো অনেকেই এই পুকুরে গোসল করে আমরা তো গোসল করি না শুধু হাত মুখ ধুই অযু করি তারা গোসল করলে যদি পানি অপবিত্র না হয় তাহলে আমাদের হাত পা মুখ ধোয়ার কারণে কিভাবে পুকুরের পানি অপবিত্র হয় যারা গোসল করে
তারা আমাদের ধর্মের মানুষ আর আপনারা অন্য ধর্মের তাই আপনাদের হাতের স্পর্শে আমাদের পুকুরের পানি অপবিত্র হয়ে যায় খাজা মইনুদ্দিন চিশতী রহমতুল্লাহ আলাইহি তখন বললেন আচ্ছা বাবা আমরা আর আপনাদের পুকুরের পানিতে হাত লাগাবো না তবে আমাদের যেহেতু পানির প্রয়োজন আছে তাই আমরা চাচ্ছি আপনাদের পুকুর থেকে শুধু এক পাত্র পানি তুলে নিব তখন পৃথিবীরাজ বললেন ঠিক আছে আপনারা পানি নিতে পারেন কিন্তু একটি শর্ত পানিতে শুধু আপনার পাত্র ডুবাবেন হাত স্পর্শ করবেন না যদি পানিতে হাত স্পর্শ করেন তাহলে আমরা এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিব তিনি বললেন ঠিক আছে আমরা হাত স্পর্শ করবো না পরদিন সবাই পুকুরপাড়ে উপস্থিত হলেন
খাজা মইনুদ্দিন চিশতি তার প্রধান খলিফা বখতিয়ার রহমতুল্লাহ আলাইহিকে বললেন বখতিয়ার তুমি যাও রাজার পুকুর থেকে একমাত্র পানি নিয়ে আসো কিন্তু সাবধান তোমার হাত যেন পানিতে স্পর্শ না হয় অতঃপর তিনি দরবেশের হুকুমে আনার সাগর থেকে পানি আনার জন্য এগিয়ে গেলেন তারপর পুকুরে পাত্রটি ডুবালেন তার হাত পুকুরে স্পর্শ করলেন না আনার সাগরের যত পানি ছিল সব পানি ছোট্ট একটি পাত্রের মধ্যে প্রবেশ করল আস্তে আস্তে আনার সাগর একদম শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেল এমন ভাবে শুকিয়ে গেল যে পুকুরের নিচের বালিগুলো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল ব্রাহ্মণরা যখন দেখল তাদের পবিত্র পুকুরটি একদম শুকিয়ে গেছে তখন তারা হতবাক হয়ে রাজা পৃথিবীরাজের কাছে
গিয়ে বলল মহারাজ অনেক বড় বিপদ হয়ে গেছে তিনি জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে তারা উত্তর দিলেন সেই ফকির জাদুর মাধ্যমে আমাদের পবিত্র পুকুরের সব পানি নিয়ে গেছে এখন আমাদের পবিত্র পুকুরে আর এক ফোঁটা পানিও নেই মহারাজ যদি আমাদের পুকুরে আর পানি না থাকে তাহলে আমরা আমাদের সারাদিনের পাপগুলো কিভাবে মোচন করব দূর-দূরান্ত থেকে অনেক হিন্দুরা এখানে আসে তাদের পাপম মোচনের জন্য এখন পুকুরে যদি পানি না থাকে তাহলে কোন মানুষই এখানে আর আসবে না ফলে ব্যবসায়িক দিক থেকেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব আজমিরের অস্তিত্ব ধুলার সাথে মিশে যাবে তখন রাজা মহাচিন্তায় পড়ে গেলেন তিনি খাজা মইনুদ্দিন চিশতি রহমতুল্লাহ আলাইহি এর
বিরুদ্ধে কোন কঠিন পদক্ষেপ নিতেও ভয় পাচ্ছিলেন রাজা ভাবতে লাগলেন তার বিরুদ্ধে আমি যদি কোন সৈন্য পাঠাই তিনি যদি সেই সৈন্যদের কেউ কোন জাদু করেন তাহলে তো আরো ঝামেলা বেড়ে যাবে এসব ভেবে তিনি ব্রাহ্মণদের বলতে লাগলেন তোমরা যাও ওই ফকির বাবাকে আবার আমার কাছে নিয়ে আসো তার সাথে কথা বলে দেখি তিনি কি চান যদি তার চাওয়া আমাদের কাছে যুক্তিসংগত হয় তাহলে আমরা তার দাবি পূরণ করব আর যদি যুক্তিসংগত না হয় তাহলে আমরা সবাই তার কাছে ক্ষমা চেয়ে আমাদের পুকুরের পানি ফিরিয়ে দিতে বলব পরদিন রাজার দরবারে খাজা মইনুদ্দিন চিশতি রহমতুল্লাহ আলাইহিকে হাজির করা হলো তখন রাজা করুণ
শহরে বলতে লাগলেন বাবা আপনি জাদু করে আমাদের পুকুরের সব পানি তুলে নিয়ে গেছেন এখন এখন আমরা আমাদের পাপগুলোকে কিভাবে মোচন করব সারাদিনের করা পাপগুলো এই পুকুরে গোসল করে আমরা ধুয়ে ফেলি এখন যদি পুকুরে পানি না থাকে তাহলে আমরা কিভাবে পাপ মোচন করব তখন খাজা মইনুদ্দিন চিশতী রহমতুল্লাহ আলাইহি বললেন দেখুন বাবা আপনাদের কাছে না হয় আনার সাগর আছে কিন্তু সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিটা প্রান্তরে আনার সাগর নেই তাহলে যেখানে আনার সাগর নেই সেখানকার মানুষগুলো কিভাবে তাদের পাপ মোচন করবে আসলে পাপম মোচন করার ক্ষমতা এই পুকুরের নেই সকল পাপ মোচন করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে যিনি সমস্ত আসমান জমিন
ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যার হুকুম ছাড়া একটি গাছের পাতাও নড়ে না তাই আমি আপনাদেরকে দাওয়াত দিচ্ছি আপনারা ভ্রান্তির পথ ত্যাগ করে হেদায়েত ও নূরের পথে ফিরে আসুন সেখানে উপস্থিত থাকা হাজার হাজার হিন্দু এই দরবেশের কথাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন অতঃপর দরবেশ বললেন যাও বখতিয়ার তুমি যে পাত্রে পানি ভরেছিলে সেই পানিগুলোকে আবার পুকুরে ঢেলে দিয়ে আসো তখন তিনি পাত্রটি নিয়ে পুকুর পাড়ে গেলেন এবং পাত্রের পানি সেই পুকুরে ঢালতে শুরু করলেন ঢালার সঙ্গে সঙ্গেই পুকুরটি পুনরায় কানায় কানায় পানিতে ভর্তি হয়ে গেল মইনুদ্দিন চিশতী রহমতুল্লাহ আলাইহির এই বিস্ময়কর কেরামত দেখে অসংখ্য হিন্দু মানুষ তার দিকে এগিয়ে আসলো ও
সঙ্গে সঙ্গে তার সাথে কালেমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেল মন্দিরের ব্রাহ্মণরা যখন দেখল হাজার হাজার হিন্দু মুসলিম হয়ে যাচ্ছে তখন তারা এ কথাগুলো রাজাকে জানাতে চলে চলে আসে রাজার দরবারে সব কথা শুনে রাজা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন আচ্ছা আপনারাই বলুন এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা কি উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারি তখন ব্রাহ্মণরা বলল এই ফকির বাবা একজন মস্ত বড় জাদুকর অতএব জাদু মোকাবেলা জাদু দিয়েই করতে হবে আমাদের মধ্য থেকে একজন দক্ষ জাদুমন্ত্র জানা ব্রাহ্মণকে আপনি সেই ফকিরের সাথে মোকাবেলা করার জন্য পাঠান যদি আমাদের সেই ব্রাহ্মণ তার মন্ত্র দিয়ে ফকির বাবাকে পরাজিত করতে পারে তাহলে আমরা আমাদের হিন্দু
ধর্মকে কে টিকিয়ে রাখতে পারবো তৎকালীন যুগে রামদূত নামে এক বড় ব্রাহ্মণ ছিলেন পৃথিবীরাজ তাকে ডেকে পাঠালেন তিনি উপস্থিত হলেন যখন রাজা বললেন রামদূত আমি আপনাকে দায়িত্ব দিচ্ছি যে খাজা মইনুদ্দিন চিস্তি নামে একজন ফকির আমাদের রাজ্যে এসে জাদুর মাধ্যমে অনেক হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করছে তাই আপনি তাকে জাদুর মাধ্যমে পরাজিত করুন তিনি বললেন ঠিক আছে মহারাজ আপনি কোন চিন্তা করবেন না আমি অবশ্যই এই ফকিরকে পরাজিত করতে পারবো তখন রামদূত তার সঙ্গীদেরকে সাথে নিয়ে ফকির বাবার কাছে হাজির হলেন সেখানে তিনি গিয়ে বললেন হে ফকির বাবা আপনি যদি সত্যিই বড় কোন জাদুকর হয়ে থাকেন তাহলে আসুন আমার সাথে জাদুর মোকাবেলা
করুন কিন্তু ফকির বাবা তার কথাগুলো কোন উত্তর দিচ্ছিলেন না তখন রামদূত অনেক খারাপ খারাপ কটুক্তি করছিলেন ফকির বাবাকে সে যখন ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল তখন ফকির বাবা রেগে গিয়ে তার চোখের দিকে চোখে রেখে উচ্চকণ্ঠে বললেন রামদূত তুমি এত চিৎকার করে কথা বলছো অথচ আমি তোমার কপালে ঈমানী জ্যোতি দেখতে পাচ্ছি ফকির বাবার এই কথা কথাগুলো তার কানে শ্রবণ করার সাথে সাথে সারা গায়ে কাঁপন শুরু হয়ে গেল এর মাধ্যমেই মহান আল্লাহ তার ভিতরে ঈমানের নূর ঢুকিয়ে দিলেন তখন রামদূত তার পায়ের নিচে লুটিয়ে পড়লেন এবং বললেন হে আল্লাহর কামেল অলি আমি আপনাকে চিনতে না পেরে অনেক বেয়াদবি করেছি
আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন আপনি আমাকে কালেমা পাঠ করিয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসার সুযোগ দান করুন তারপর সেখানে রামদূত খাজা বাবার হাতে হাত রেখে কালেমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেলেন খাজা বাবা তার নাম রাখলেন মোহাম্মদ সাদি ইতিহাস থেকে জানা যায় পরবর্তীতে রামদূত একজন বিশাল আল্লাহর ওলি হয়েছিলেন আজমিরের এক হিন্দু ব্রাহ্মণ সবসময় একটা মন্দিরের পূজা করতো প্রতিদিন সে একটি পাত্রী দুধ নিয়ে যেত আর মূর্তির পায়ে ঢেলে দিয়ে আসতো একদিন ব্রাহ্মণের মেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল বাবা তুমি প্রতিদিন মূর্তির পায়ে দুধ ঢেলে দিয়ে আসো আজ আমি যাব দুধ নিয়ে মন্দিরে এবং মূর্তিকে সে দুধ খাইয়ে দিয়ে আসবো তখন
তিনি উত্তর দিলেন মা মূর্তি তো কখনো দুধ পান করে না সে বলল দেখি বাবা আমার হাতে মূর্তি পান করে কিনা ঠিক আছে মা কাল তুমি যেও পরদিন মেয়েটি একটি পাত্রে দুধ নিয়ে মন্দিরে গেল এবং মূর্তির সামনে গিয়ে বলতে লাগলো এই নাও আজকে আমি দুধ নিয়ে এসেছি তুমি দুধ পান করো এভাবে সে বারবার চিৎকার করে বলতে লাগলো কিন্তু মূর্তির পক্ষ থেকে কোন সাড়া শব্দ আসলো না মেয়েটি একা একা মূর্তির সাথে কথা বলতে লাগলো যখন দেখল মূর্তি তার হাতে দুধ পান করছে না তখন সে খুব কান্নাকাটি করতে শুরু করল মন্দিরের পাশ দিয়ে খাজা মইনুদ্দিন চিশতি রহমতুল্লাহ আলাইহি
যাচ্ছিলেন তিনি মেয়েটিকে কান্না করতে দেখে মন্দিরের কাছে এগিয়ে আসলেন আর বললেন কি হয়েছে মা তুমি এখানে এত কান্নাকাটি করছো কেন আর তোমার কপাল থেকে রক্ত ঝরছে কেন সে বলল আপনি এখানে কেন এসেছেন এটা আমার আর আমার উপাস্যের ব্যাপার আমি আমার আরাধ্যকে দুধ পান করাতে এসেছি কিন্তু তিনি দুধ পান করছেন না তাই আমি কান্না করছি খাজা বাবা বললেন দেখো মা মূর্তি কখনো হাত পা নাড়াতে পারে না তাহলে সে কিভাবে তোমার দুধ পান করবে তুমি অযথা জেদ করছো মেয়েটি বলল না আমি মূর্তিটিকে দুধ পান করিয়ে বাড়ি যাব না হলে এখানে আমার প্রাণ দিয়ে দেব তিনি যখন মেয়েটির
ভেতরে এমন প্রতিজ্ঞা দেখলেন তার প্রতি খুব মায়া হয়ে গেল তখন তিনি মূর্তির কাছে গিয়ে মূর্তিটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন তুমি দুধ কেন পান করছো না এই মেয়েটিকে এত দুঃখ দিচ্ছ কেন তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না এই মেয়েটির মাথা থেকে রক্ত বের হচ্ছে সাথে সাথে মূর্তিটি নড়াচড়া করতে লাগলো তারপর দুধের পাত্র ধরে দুধ পান করতে শুরু করল মেয়েটি তখন খুব খুশি হলো আর বলল এখন আমি বাড়ি যাব আর সবাইকে গিয়ে বলবো আজ আমি মূর্তিকে দুধ পান করিয়েছি এই বলে মেয়েটি বাড়ির দিকে যেতে লাগলো মাঝ রাস্তায় কয়েকজন লোক তার মাথায় রক্ত ও আঘাতের চিহ্ন দেখে তার বাবাকে বলল
তোমার মেয়ের মাথায় রক্ত লেগে আছে কেন তোমার কি হয়েছে মা তোমাকে কে এভাবে অত্যাচার করেছে সে হাসিমুখে উত্তর দিল আমার কিছু হয়নি বাবা আজ আমি আমার আরাধ্যকে দুধ পান করিয়েছি সবাই বলল তোমার মেয়ে পাগল হয়ে গেছে মূর্তি কি কখনো পান করে নাকি মেয়েটি বলল আমি সত্যি বলছি যদি বিশ্বাস না হয় আমার সঙ্গে চলুন আমি আবার আপনাদের সামনে মূর্তিকে দুধ পান করাবো তখন সবাই মেয়েটির সাথে মন্দিরের দিকে চলল সেখানে গিয়ে মেয়েটি পুনরায় মূর্তিকে দুধ পান করার জন্য বলল বারবার বলতে লাগলো আপনি দুধ পান করে নিন কিন্তু তখন সেই মূর্তিটি একদম নড়াচড়া করল না লোকজনেরা বলতে লাগলো
মেয়েটি সত্যিই পাগল হয়ে গেছে দেবতা কি কখনো নড়াচড়া করতে পারে তখন মেয়েটি বলল হে প্রভু আপনি কি দুধ পান করবেন নাকি সেই বুজুর্গ ব্যক্তিকে ডেকে নিয়ে আসবো মেয়েটির এমন এমন কথা শুনে মূর্তিটি পাত্রটিকে উঠিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ দুধ পান করে নিল উপস্থিত সবাই এমন বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেল এবং বলতে লাগলো মা কে সেই বুজুর্গ তার নাম শুনতেই মূর্তিটি দুধ পান করে নিল মেয়েটি বলল আমি তো তার নাম ঠিকানা জানিনা তবে তিনি এইদিকেই আসছিলেন তখন উপস্থিত সবাই খাজা মইনুদ্দিন চিশতি রহমতুল্লাহ আলাইহির সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ দেখতে পেলেন একটি নির্জন জায়গায় গাছের নিচে একজন
লোক মেয়েটি বলল তিনি সেই বুজুর্গ ব্যক্তি তখন সবাই এগিয়ে গিয়ে বলল বাবা আপনি কি জাদু করেছেন যার ফলে পাথরের মূর্তি দুধ পান করে তিনি উত্তর দিলেন এটা কোন জাদু নয় এগুলো সবই আমার রবের ইচ্ছা তারা বলল আপনার রব কে আমার রব সবাইকে জীবনদান করেন তার হুকুমে আকাশ বাতাস পাতাল সবকিছু চলে তারা জিজ্ঞেস করল আপনি কে আপনার মাযহাবা কি তখন তিনি বললেন আমার মাযহাব ইসলাম আমার নবীর নাম হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তারা বলল বাবা আমরা সবাই মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত হতে চাই খাজা গরীবে নেওয়াজ মইনুদ্দিন চিশতী রহমতুল্লাহ আলাইহি এর সাথে কালেমা পাঠ
করে তারা মুসলমান হয়ে গেল একদিন খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহ আলাইহি একটি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন যাওয়ার সময় তিনি দেখতে পেলেন কিছু মানুষ একসঙ্গে আগুনের পূজা করছে তারা এমন ভাবে তপস্যা করতো যে তারা ছ মাস পর্যন্ত নিজের মুখে দানা পানি দিত না তখন খাজা বাবা তাদের জিজ্ঞেস করলেন তোমরা আগুনকে পূজা করছো কেন তারা বলল আমরা আগুনের পূজা এজন্য করি যাতে মৃত্যুর পর এই আগুন আমাদের কষ্ট না দেয় তিনি বললেন মৃত্যুর পরের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার পদ্ধতি এটা নয় দোযখের আগুন থেকে বাঁচার পদ্ধতি হচ্ছে দোজখকে যিনি বানিয়েছেন তার পূজা করা তাহলে এই আগুন তোমাদের আর কোন ক্ষতি করতে
পারবে না তোমরা যে এতদিন ধরে পূজা করছো তোমরা এই আগুনে হাত দিয়ে দেখাও তো আগুন তোমাদের কথা শোনে কিনা তারা বলল যদি আমরা হাত দেই তাহলে তো আমাদের হাত পুড়ে যাবে কিন্তু আপনি তো বলছেন আল্লাহর পূজা করলে এই আগুন জ্বালাবে না এই কথার কোন প্রমাণ কি আপনার কাছে আছে তিনি বললেন আমরা আল্লাহর বান্দা আমাদের শরীরকে তো দূরের কথা আমাদের চপ্পলকেও জ্বালাতে পারবে না এই কথা বলে তিনি তার একটি চপ্পলকে আগুনে ফেলে দিলেন অনেকক্ষণ পর্যন্ত সেই চপ্পল আগুনের মাঝে থাকলো কিন্তু সেই আগুনের সামান্য প্রভাবটুকু সেই চপ্পলে পড়লো না উপস্থিত সকলে হতবাক হয়ে খাজা বাবার কাছে আসলো
এবং তার সাথে কালেমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেল