[মিউজিক] একদিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন এক বৃদ্ধা মহিলা তার বাড়ির দরজার সামনে বসে আছেন। তার সামনে কিছু মালপত্র গুছিয়ে রাখা মুখে চিন্তার ছাপ। তিনি ব্যস্তভাবে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলেন যেন কোথাও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যখন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী প্রচার করতে শুরু করলেন যে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। তিনিই সর্বশক্তিমান। আর আমি মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। তখন মক্কার কুরাইশরা তার বিরুদ্ধে শত্রুতা শুরু করল। কেউ বলতো তিনি একজন জাদুকর। নাউজুবিল্লাহ। কেউ বলতো তিনি একজন কবি যিনি মিথ্যা কথা দিয়ে সরল মানুষকে ভুল পথে টানছেন। কিন্তু বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধৈর্যশীল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসীম
ধৈর্য ধরলেন। সমস্ত কষ্ট নীরবে সহ্য করলেন। একটি মুহূর্তের জন্য আল্লাহর পথে ডাকার কাজ থামালেন না। তার দৃঢ় বিশ্বাস আর অটল মনোবল ছিল পাহাড়ের চেয়েও শক্ত। কত মহান ছিলেন তিনি। সেই বৃদ্ধা তার বাড়ির উঠানে বসে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেই বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন না জানি যদি তার সাথে আমার দেখা হয়ে যায়। যদি সেই জাদুকর আমাকে কথা শুনিয়ে আমার মনও বদলে দেয়। তিনি মনে মনে কল্পনা করলেন সেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামের মানুষটির কথা যার সম্পর্কে তিনি এতদিন শুনে এসেছেন। সবাই বলে তিনি মানুষের হৃদয়ে এমন কথা বলেন যা শুনলে কেউ আর তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে
না। না আমি আর এই শহরে থাকতে পারবো না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে চলে যেতে হবে। ঠিক তখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। বৃদ্ধাকে দেখে একটু থামলেন। তিনি বুঝতে পারলেন বৃদ্ধা কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু তিনি খুবই দুর্বল। মালপত্রগুলো বেশ ভারী দেখাচ্ছে। নবীজি স্নেহভরা কন্ঠে বললেন আম্মা আপনি কোথায় যাচ্ছেন? বৃদ্ধা একটু চমকে উঠলেন আর বললেন ব্যাটা আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়। এখানে এক জাদুকর এসেছে যে মানুষের মনকে তার দিকে টেনে নেয়। আমি চাইনা আমারও সেই দশা হোক। নবীজি মাথা ঝুকিয়ে শুনলেন তার চোখে কোন বিষয় নেই। মুখে কোন
বিরক্তি নেই। তিনি বলেন, আম্মা তাহলে কি আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি? আপনার বোঝা তো অনেক ভারী দেখাচ্ছে। বৃদ্ধা কিছুক্ষণ নবীজির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এ কেমন তরুণ? আজকালকার যুগে কেউ কি কারো জন্য এত চিন্তা করে? তারপর অনেক চিন্তাভাবনার পর তিনি বলেন ব্যাটা যদি তুমি আমার এই মালপত্রগুলো আমার মাথায় তুলে দাও তাহলে আমার বড় উপকার হয়। নবীজি একটু এগিয়ে গেলেন মালপত্রগুলো তুলতে গেলেন। বোঝা বেশ ভারী। তিনি বুঝতে পারলেন বৃদ্ধার পক্ষে এগুলো বহন করা একেবারেই অসম্ভব। তাই নবীজি বললেন আম্মা আপনার বোঝা তো বেশ ভারী। আর আপনি তো বয়সেও অনেক বড় হয়ে গেছেন। যদি আপনি অনুমতি দেন তাহলে কি
আমি আপনাকে আপনার গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারি? বৃদ্ধা এবার অবাক হলেন। এই যুবক এত বিনয়ী এত দয়ালু তিনি এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর গভীর কৃতজ্ঞতায় বললেন, ব্যাটা, এর চেয়ে বড় দয়া আর কি হতে পারে? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃদ্ধার বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন এবং ধীর পায়ে তার সঙ্গে হাঁটতে লাগলেন। বৃদ্ধা হাঁপাচ্ছিলেন কিন্তু কথা থামাচ্ছিলেন না। পথ চলতে চলতে নবীজির দিকে তাকিয়ে বললেন, ব্যাটা আমি তোমাকে একটা কথা বলছি। শোনো তুমি যদি বুদ্ধিমান হও তাহলে এই শহর ছেড়ে চলে যাও। এখানে এখন এক ভয়ঙ্কর জাদুকর এসেছে। তার নাম মোহাম্মদ। সে নিজেকে নবী বলে দাবি
করে। আমাদের পূর্বপুরুষদের উপাস্যদের নিয়ে মিথ্যা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। নবীজি নীরবে হাঁটছিলেন, কিন্তু কোন উত্তর দিলেন না। বৃদ্ধা একটু থেমে নিঃশ্বাস নিলেন। তারপর আবার বলতে লাগলেন, সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার কি জানো? তার কথার মধ্যে এমন এক জাদু আছে যে, একবার শুনলেই মানুষ তার হয়ে যায়। তার কথায় সবাই মুগ্ধ হয়ে যায়। তারপর তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে। কত মানুষ যে তার ফাঁদে পড়ে গেছে। বৃদ্ধা অসহায়ভাবে মাথা নাড়লেন। যেন কত বড় একটা বিপদের কথা বলছেন। নবীজি নির্বিকারভাবে তার কথা শুনতে লাগলেন যেন তিনি কিছুই শুনছেন না। বৃদ্ধা এবার একটু গম্ভীর স্বরে বললেন, ব্যাটা আমি সারাজীবন আমার মূর্তিদের উপাসনা করেছি।
আমি চাইনা যে শেষ বয়সে এসে আমার বিশ্বাস নড়বরে হয়ে যাক। আমার পূর্বপুরুষেরা যেভাবে জীবন কাটিয়েছে আমিও সেভাবেই কাটাতে চাই। আমি চাইনা ওই মোহাম্মদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে যাই। আমি তোমাকেও সতর্ক করে দিচ্ছি তার থেকে দূরে থাকো। এইভাবে পুরো রাস্তা জুড়ে বৃদ্ধা একনাগারে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে লাগলেন। তিনি নানা কঠু কথা বললেন, অপমান করলেন। বারবার সাবধান করলেন যেন নবীজির ধারে কাছেও না যান। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটিও কথা বললেন না। তিনি কেবল মাথা নিচু করে হাঁটছিলেন। কাঁধে বৃদ্ধার বোঝা বহন করছিলেন, যেন কিছুই ঘটেনি। অনেকক্ষণ পর বৃদ্ধা তার গন্তব্যে পৌঁছে গেলেন। নবীজি ধীরে
ধীরে তার বোঝা নামিয়ে রাখলেন যেন বৃদ্ধা কষ্ট না পান। তারপর ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। বৃদ্ধা বিস্মিত হয়ে বললেন, ব্যাটা, তুমি কে? তুমি তো তোমার নামও বললে না এতটা পথ আমার বোঝা বহন করলে একবারও বিরক্ত হলে না কিছু বললে না আমি আমার পরিবারের সবাইকে বলব যে আজ এক তরুণ আমাকে এমনভাবে সাহায্য করলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃদু হেসে বললেন আম্মা নাম জেনে কি হবে আপনার কাজ তো হয়ে গেছে এটাই যথেষ্ট বৃদ্ধা ছিলেন নাছোর বান্দা তিনি মাথা নাড়লেন না না আমি তোমার নাম জানতেই চাই এত ভালো একজন মানুষ এত এত দয়ালু তোমার নাম তো জানতেই হবে।
নবীজি এবার একটু থামলেন। তারপর নরম স্বরে বললেন আম্মা যাকে তুমি সারাটা রাস্তা গালমন্দ করছিলে অপমান করছিলে। যার সম্পর্কে তুমি বলছিলে সে একজন জাদুকর। যার নাম মোহাম্মদ আমি সেই মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ। বৃদ্ধা বিশ্বয় স্তব্ধ হয়ে গেলেন। যেন এক মুহূর্তের জন্য তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না। গলা শুকিয়ে এল। ঠোট কাঁপতে লাগলো। তিনি একবার নবীজির মুখের দিকে তাকালেন আবার একবার নিজের কাঁপতে থাকা হাতের দিকে বৃদ্ধা কাঁপা কন্ঠে বললেন তুমি তুমি ই মোহাম্মদ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নরম হেসে মাথা ঝুকিয়ে বললেন হ্যাঁ আম্মা আমি ই মোহাম্মদ বৃদ্ধা এক ধাক্কায় যেন চুপসে গেলেন তার মনে পড়ে গেল পুরো পথের কথা কিভাবে
তিনি নবীজিকে একের পর এক কটু কথা বলেছেন কিভাবে তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাদুকর মিথ্যাবাদী বলে গালমন্দ করেছেন। অথচ সেই মানুষটি বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে তার বোঝা বহন করলেন। বিনা বাক্যে তার কথাগুলো শুনলেন। এমনকি তার গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। বৃদ্ধার চোখ দিয়ে গরম অশ্রু ঝরতে লাগল। এতক্ষণ যার বিরুদ্ধে তিনি কথা বলছিলেন যাকে তিনি ভয় পেতেন। সেই মহান হৃদয়ের মানুষটি তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন একটিবারের জন্যও নিজের পরিচয় দেননি। তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। কাঁপতে কাঁপতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পায়ের কাছে নত হয়ে বসলেন। হাত দুটি নবীজির পায়ের উপর রেখে কেঁদে ফেললেন। অশ্রুশিক্ত কন্ঠে বললেন, "আমি সারাটা
পথ তোমার সম্পর্কে কটু কথা বলেছি। তোমাকে অপমান করেছি। অথচ তুমি আমার জন্য কিছু বলোনি। উল্টো আমার বোঝা কাঁধে তুলে নিয়েছো। আমার কি জানা উচিত ছিল না যে সত্যিকারের মহান ব্যক্তিরাই এমন হয়? নবীজি নম্রকণ্ঠে বললেন আম্মা আপনি কিছু জানতেন না তাই তো বলেছিলেন আর যে জানে না তাকে যদি ধৈর্য ধরে বোঝানো যায় তাহলে সে একদিন সত্য উপলব্ধি করবেই বৃদ্ধার কান্না থামছিল না তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে গভীর বেদনায় বললেন আমি ভুল করেছিলাম আমি এতদিন মিথ্যা শুনেছি আমাকে এতদিন ভুল শিখানো হয়েছে মোহাম্মদ আমি এখন বুঝতে পারছি তুমি সত্য ও ন্যায় পরায়ণ তুমি নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল তিনি উঁচু কন্ঠে
বললেন আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি মোহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। এমনি আরেকটি ঘটনা। মক্কার কুরাইশ বংশের এক নামকরা নেতা ছিল আবু লাহাব। তার আসল নাম ছিল আব্দুল উজ্জা। কিন্তু তার মুখ সবসময় লালচে থাকতো যেন আগুনের শিখা জ্বলছে। তাই লোকে তাকে আবু লাহাব অগ্নিশিখার জনক বলে ডাকতো। কিন্তু সে ছিল ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আপন চাচা হয়েও প্রথম দিন থেকেই তার দাওয়াতের বিরোধিতা করে আসছিল| যতবার নবীজি ইসলাম প্রচার করতেন আবু লাহাব ততবার তার পেছনে গিয়ে লোকদের বিভ্রান্ত করতো| একদিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে মক্কার
বিখ্যাত সফা পাহাড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মক্কায় এটা ছিল প্রচলিত রীতি যখন কেউ জরুরি কিছু ঘোষণা করতে চায় তখন এই পাহাড়ে উঠে ডাক দিত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিনও জোরে জোরে ডাক দিলেন হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা তোমরা সবাই এখানে আসো এই ডাকে মক্কার লোকেরা দ্রুত জড়ো হয়ে গেল সবাই আগ্রহী হয়ে উঠল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন লোকেরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে তখন তিনি বললেন বলতো যদি আমি বলি যে এই পাহাড়ের ওপাশে এক বিশাল বাহিনী লুকিয়ে আছে যারা তোমাদের আক্রমণ করতে আসছে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে লোকেরা একসঙ্গে জবাব দিল অবশ্যই তুমি তো কখনো মিথ্যা বলোনি। সবাই
নিশ্চিন্ত ছিল। কারণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আল আমিন বিশ্বস্ত। তার জীবনে কেউ একটাও মিথ্যা শোনেনি। ঠিক তখনই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে শোনো, আমি তোমাদের সতর্ক করতে এসেছি। তোমাদের রব এক আল্লাহ তার কোন অংশীদার নেই। আমি তোমাদের জন্য এক কঠিন দিনের শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করছি। নবীজির কথা শুনে সবাই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু আবু লাহাব প্রচন্ড রেগে গেল। সে ভীষণ চিৎকার করে উঠলো তোমার সর্বনাশ হোক এজন্যই আমাদের এখানে ডেকেছো। এরপর সে দম্ভরে নবীজিকে উপহাস করল। আর বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে চলে গেল। এই ঘটনার পরেই আল্লাহ তা'আলা আবু লাহাবের বিরুদ্ধে কুরআনে এক
শক্তিশালী আয়াত নাযিল করলেন। আবু লাহাবের দুই হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। সূরা আল মাসাদ আয়াত এক এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর আবু লাহাব আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো| সে নবীজিকে দমিয়ে রাখার জন্য আরো বেশি বাধা দিতে লাগলো| নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন বাজারে যেতেন আল্লাহর পথে ডাক দিতেন তখন আবু লাহাব লোকদের বলতো এই লোক পাগল এর কথা শুনোনা কখনো বলতো এ আমার ভাইয়ের ছেলে আমি জানিয়ে মিথ্যাবাদী লোকেরা যখন নবীজিকে নামাজ পড়তে দেখতো তখন আবু লাহাব সেখানে গিয়ে ব্যঙ্গ করতো এবং বলত এই লোক তোমাদের বিভ্রান্ত করছে। সে এক আল্লাহর ইবাদত করতে বলে তোমাদের
পূর্বপুরুষদের পথ থেকে সরাতে চায়। আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলও ছিল ইসলামের কঠোর বিরোধী। সে ছিল আবু সুফিয়ানের বোন। অর্থাৎ সে ছিল এক শক্তিশালী ও সম্ভ্রান্ত নারী। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের কষ্ট দেওয়ার জন্য উম্মে জামিল নানা ষড়যন্ত্র করত। যতবার নবীজি মানুষকে ইসলামের দিকে ডাকতেন উম্মে জামিল ঠিক ততবার তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতো| সে কেবল নিজের স্বামী আবু লাহাব কে সহায়তা করত না বরং নিজেও সক্রিয়ভাবে নবীজি ও তার সাহাবীদের কষ্ট দেওয়ার জন্য নানা ফন্দি আঁকতো সে গোপনে গিয়ে নবীজির চলার পথে ধারালো কাঁটা শুকনো কাঁটাযুক্ত ডালপালা ফেলে রাখতো বিশেষ করে রাতের বেলা সে রাস্তার এক কোণে
দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিত করত যেন কাঁটাগুলো ঠিক সেই জায়গায় পড়ে যেখানে দিয়ে নবীজি হাটেন তারা আশা ছিল যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালে বের হবেন তার পায়ে কাঁটা ফুটবে তিনি ব্যথা পাবেন রক্ত বের হবে কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো অভিযোগ করতেন না তিনি ধৈর্য ধরতেন তিনি শুধু রাস্তা পরিষ্কার করতেন আর আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন হে আল্লাহ তুমি সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করো উম্মে জামিল শুধু কাঁটাই ছড়াতো না তার মুখ থেকেও বের হতো বিষের মতো কথা নবীজি যেখানে যেতেন সে তার পেছনে গিয়ে লোকদের বলতো এই লোক মিথ্যাবাদী। একজন জাদুকর। ওর কথা শুনলে সবাই বিপথে চলে যাবে। কোরআনের সূরা
আল মাসাদ নাযিল হওয়ার পর সে এত রেগে গেল যে একদিন সে হাতে বড় একটা পাথর নিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আঘাত করতে এল। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবা চত্তরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর পাশে বসে ছিলেন কিন্তু আল্লাহর কুদরতে উম্মে জামিল তাকে দেখতে পেল না| সে শুধু আবু বকরকে দেখল এবং বলল তোমার সাথী মোহাম্মদ কোথায় আমি ওকে হত্যা করব বদরের যুদ্ধ যখন হলো তখন আবু লাহাব নিজে যুদ্ধে যায়নি সে মক্কায় থেকে গোপনে খবরের অপেক্ষা করছিল সে আশা করছিল কুরাইশ বাহিনী নিশ্চয়ই মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে কিন্তু যখন খন একদম উল্টো খবর এলো তখন সে
হতবাক হয়ে গেল যখন একজন এসে বলল মুসলমানরা জয়ী হয়েছে কুরাইশের বড় বড় নেতারা নিহত হয়েছে আবু জাহেলও মারা গেছে এই খবর শুনে আবু লাহাবের মুখ কালো হয়ে গেল তার শরীর কাঁপতে লাগল সে বিশ্বাস করতে পারছিল না মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারীরা মাত্র 313 জন অথচ তারা কুরাইশের শক্তিশালী 1000 সৈন্যকে পরাজিত করেছে সে ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করল এ অসম্ভব কুরাইশ পরাজিত হতে পারে না। কিন্তু এই সত্য মেনে নেওয়া ছাড়া তার আর কোন উপায় ছিল না। বদরের যুদ্ধের পর থেকেই আবু লাহাব মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে গিয়েছিল। এরপর কয়েকদিনের মধ্যেই তার শরীরে দেখা দিল এক
অদ্ভুত রোগ। সে অনুভব করল তার শরীর ভেতর থেকে পচতে শুরু করেছে। প্রথমে তার গায়ে ছোট ছোট ফুসকুড়ি দেখা দিল। তারপর ফুসকুরি গুলো বড় হতে লাগলো। তার শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হতে লাগল। দিনের পর দিন তার শরীরে দূষিত রক্ত আর পুঁজ জমতে থাকলো। এই রোগ ছিল প্লেগ বা গুটি বসন্তের মতো। মক্কার লোকেরা একসময় বুঝতে পারল আবু লাহাবের শরীরে এক ভয়ানক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। একজন বলল, ওর শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। আমি ওর পাশে থাকলে নিজেও আক্রান্ত হয়ে যাব। তারপর সবাই দূরে সরে গেল। তার নিজের আত্মীয়রাও তার কাছে আসতে চাইলো না। আবু লাহাব কাতরাতে লাগল। সে চিৎকার
করে ডাকল, কেউ আমাকে একটু পানি দাও। কেউ আমার পাশে বসো। কিন্তু কেউই এলো না। তারই পরিবার তারই কুরাইশ বংশের লোকেরা। সবাই দূর থেকে তার দুর্দশা দেখল। কিন্তু কেউ কাছে গেল না। সে একা অসহায় অবস্থায় ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। অবশেষে সে মারা গেল। তার মৃতদেহ স্পর্শ করতেও কেউ রাজি হলো না। লোকেরা তার লাশ দেখেও কাছে গেল না। কেউ কেউ বলল, এই লাশে রোগ ছড়িয়ে আছে। যদি স্পর্শ করি আমরাও সংক্রমিত হয়ে যাব। তার আত্মীয়রা কেউ সাহস করল না তাকে গোসল করাতে কাপড়ে জড়াতে কবর দিতে অবশেষে তারা একটি লম্বা লাঠি নিল লাঠি দিয়ে দূর থেকে
তার লাশ ধাক্কা দিয়ে এক গর্তের দিকে ঠেলে দিল তারপর উপর থেকে মাটি ও পাথর চাপা দিয়ে দিল এমনি আরেকদিনের ঘটনা মক্কার পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবলেন যদি মক্কার লোকেরা সত্যকে গ্রহণ না করে তাহলে হয়তো অন্য কোন শহরের মানুষ ইসলামের এর দাওয়াত গ্রহণ করবে। এমন ভাবনা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তায়েফ সফরে যাবেন। এখানে বসবাস করত বনু সাকিফ গোত্র যারা নিজেদের শক্তিশালী ও অভিজাত মনে করত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশা করলেন যদি তায়েফের নেতারা ইসলামের বার্তা গ্রহণ করে তাহলে এখানেই ইসলামের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে উঠবে। যাত্রা শুরু হলো। নবীজি
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একা যাননি। জায়েদ ইবনে হারিসা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে সঙ্গে নিলেন। এই তরুণ সাহাবী নবীজিকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন তার একান্ত বিশ্বস্ত সহচর। তারা পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তায়েফের দিকে রওনা হলেন। পথ দীর্ঘ ক্লান্তিকর। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে ছিল একটাই আশা। হয়তো তায়েফের মানুষ সত্যকে গ্রহণ করবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তায়েফে পৌঁছালেন তখন তিনি শহরের প্রধান তিন নেতার কাছে গেলেন| তারা ছিল আবুদিয়ালাইল মাসউদ ও হাবিব| নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন তিনি বললেন আল্লাহ এক তার কোন অংশীদার নেই আমি তার প্রেরিত রাসূল যদি তোমরা সত্যের
পথে আসো তাহলে তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি রয়েছে কিন্তু তায়েফের নেতারা নবীজির কথা শুনেই উপহাস করতে লাগল একজন বলল আল্লাহ কি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে নবী বানাতে পারেনি? অন্যজন বলল তুমি যদি সত্যিই নবী হও তাহলে তোমার সাথে কথা বলা আমাদের জন্য বিপদজনক। আর যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও তাহলে তোমার কথা শোনা আমাদের সময়ের অপচয়। তারা কেউই নবীজিকে একটুও সম্মান দিল না। বরং তাকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে তায়েফ থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তারা শহরের উৎশৃঙ্খল যুবকদের কাছে ডাক পাঠালো এবং তাদেরকে বলে দিল এই লোকটাকে আমাদের শহর থেকে তাড়িয়ে দাও যেন আর কখনো এখানে না আসে|
এমন আদেশ পাওয়া মাত্রই শহরের বখাটে যুবকরা একত্র হল তারা নবীজির পেছনে ধাওয়া করল তারা পাথর ছুড়তে শুরু করল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পা থেকে রক্ত ঝরতে লাগল জায়েদ ইবনে হারিসা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন কিন্তু তিনি নিজেও পাথরের আঘাতে আহত হতে লাগলেন। কিন্তু ওরা থামল না। শহরের গলিতে সরুপথে ওরা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল। অবশেষে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর পারেন না। তিনি একটানা দৌড়াতে দৌড়াতে শহরের বাইরে চলে এলেন। তার শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পা দুটো অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁপছে। তিনি আর এক পা ও সামনে বাড়াতে পারছিলেন না। ঠিক তখনই সামনে পড়লো এক বাগান। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের নিচে বসে পড়লেন। তিনি শ্বাস নিলেন কিন্তু বুকের গভীরে চাপা কষ্ট যেন ফেটে পড়ছে। জায়েদ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু পাশে বসে কাঁদছিলেন। ইয়া রাসূলুল্লাহ ওরা আপনাকে এত কষ্ট দিল অথচ আপনি কিছু বললেন না। নবীজি তখন চোখ বন্ধ করলেন। তিনি মাথা তুলে তাকালেন আকাশের দিকে। এই দুঃখ, এই অপমান, এই রক্তক্ষরণ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবকিছু নিয়ে আল্লাহর কাছে হাত তুললেন। তিনি বললেন হে আল্লাহ আমি আমার দুর্বলতা আমার শক্তিহীনতা এবং মানুষের কাছে আমার অপমানিত হওয়ার কথা তোমার কাছে অভিযোগ করছি। হে সবচেয়ে দয়ালু আল্লাহ তুমি দুর্বলদের রব আমার রব। তুমি কি আমাকে শত্রুদের হাতে ছেড়ে দেবে?
যদি তুমি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হও তাহলে আমি এই কষ্টের কোন পরোয়া করি না| রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বাগানের ছায়ায় একটু বসে আরাম নিচ্ছিলেন সেই বাগানের মালিক ছিল তায়েফের দুই ভাইরবিয়ার পুত্র উতবা ও শাইবা দূর থেকে তারা দেখছিলেন কি অবস্থা হয়েছে এই লোকটির হঠাৎ করেই একটুখানি দয়ার স্রোত বইল তাদের হৃদয়ে তারা ডাকল নিজেদের খ্রিস্টান ক্রীতদাসকে যার নাম ছিল আদাস সে মালিকদের কাছে এগিয়ে এল উতবা ও সাইবা আদাসের হাতে পাত্র ভর্তি আঙ্গুর দিল এবং বলল, এই আঙ্গুরের থোকাটা নিয়ে যাও। ওই লোকটিকে দিয়ে এসো। দেখোতো কিছু খেতে চান কিনা। আদাস নির্ধিয় সেই আঙ্গুর নিয়ে গেল রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। তিনি সামনে বসেছিলেন। আদাস তার দিকে এগিয়ে এসে ভদ্রভাবে আঙ্গুরের থোকা বাড়িয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিসমিল্লাহ বলে আঙ্গুর খেতে শুরু করলেন। আদাস একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। এরকম কথা তো এখানকার কেউ বলেন না। আপনি কোথাকার লোক? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সস্নেহে বললেন, তুমি কোথাকার? তোমার ধর্ম কি? আদাস মাথা নিচু করে বলল আমি মিনোভা শহরের মানুষ ধর্মে খ্রিস্টান স্মিত হেসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম তো তোমার দেশের লোক ছিলেন আদাস বিষয়ে বলল আপনি ইউনুসকে চিনলেন কিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নরম কন্ঠে বললেন তিনি ছিলেন আমার ভাই তিনি
ছিলেন নবী আমিও নবী এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আদাসের চোখে জল এসে গেল সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না সামনে ঝুকে পড়ে গেলস রাসূুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পায়ে চুমু খেতে লাগলো তার হাত পা ও কপালে। এদিকে দূর থেকে সবকিছু দেখছিল উতবা আরশাইবা। পরে আদাস ফিরে এলে তারা জিজ্ঞেস করল, আদাস ব্যাপার কি? তুমি ওর সঙ্গে এত আপন হয়ে গেলে কেন? আদাস শান্ত গলায় বলল, মালিক আমি দুনিয়ায় এর চেয়ে উত্তম মানুষ আর দেখিনি। তিনি এমন একটা কথা বলেছেন যা একজন নবী ছাড়া আর কেউ জানতেই পারে না। দুই ভাই চোখ বড় করে বলল, দেখো আদাস সাবধান এই লোক
যেন তোমাকে তোমার ধর্ম থেকে সরিয়ে না নিতে পারে। তোমার ধর্মই ভালো। ওর ধর্মে যেও না। আদাস চুপ করেছিল কিন্তু তার হৃদয় জানতো, আজ সে এমন এক সত্যের মুখোমুখি হয়েছে যা কোন দাসত্ব মানে না। ঠিক তখনই জিব্রাইল আলাইহিস সালাম দ্রুত চলে এলেন। তিনি নবীজিকে সালাম দিলেন এবং বললেন, "হে রাসূল, আপনার প্রতি আল্লাহর সালাম ও শান্তি বর্ষিত হোক। আপনার জন্য পাহাড়ের ফেরেশতা এখানে এসেছে। আপনি চাইলে সে এই তায়েফবাসীদের ধ্বংস করে দিতে পারে। এরপর পাহাড়ের ফেরেশতা সামনে এলেন। তিনি বললেন হে মোহাম্মদ যদি আপনি চান তাহলে আমি এই দুই পাহাড়কে একত্রিত করে তায়েফ বাসীদের পিশে ফেলবো যেন তাদের আর
অস্তিত্ব না থাকে। যদি নবীজি একবার অনুমতি দিতেন তাহলে তায়েফ এক নিমেশেই মাটির সঙ্গে মিশে যেত। কিন্তু তিনি ফেরেশতাদের বললেন, না আমি চাই না তারা ধ্বংস হোক। তারা যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে আমি কাদের কাছে যাব? তো এই ছিল আজকের ভিডিও। ভিডিওটি যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে তাহলে অবশ্যই লাইক করবেন এবং এমন আরো ভিডিও পেতে আমাদের চ্যানেলটিকে সাবস্ক্রাইব করবেন। আসসালামু আলাইকুম।