সুইজারল্যান্ডের জেলাভয়ে অবস্থিত জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সদর দপ্তর পালা নেশনস। চারপাশের আলপাস পর্বতমালার শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশের সাথে এই ভবনটির ভেতরে চলা আন্তর্জাতিক কূটনীতির কোন মিল নেই। এখানকার প্রতিটি শব্দ প্রতিটি বিবৃতি মাপা হয় খুব সতর্কতার সাথে। সাধারণত বিশ্বের বড় কোন পরাশক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি আগুল তুলতে এখানকার কূটনৈতিকরা তিনবার ভাবেন। বিশেষ করে সেই পরাশক্তি যদি হয় 140 কোটি মানুষের দেশ ভারত যার বাজার দখল করার জন্য পশ্চিমা বিশ্ব সবসময় মুখে থাকে। কিন্তু আজ জেনেভাই এই শান্ত ভবনটি থেকেই নিক্ষিপ্ত হলো এমন এক কূটনীতিক মিসাইল যা হাজার কিলোমিটার দূরের ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লির সাউথ ব্লকে আক্ষরিক অর্থে এক ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে। খবরটা
যখন সাউথ ব্লকের সুরক্ষিত সীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ল্ড রুমে পৌঁছালো তখন ভারতের শীর্ষ নীতি নির্ধারকদের কপালে স্পষ্ট বিন্দু বিন্দু ঘাম তারা স্ক্রিনের দিকে ফেলফল করে তাকিয়ে আছেন। তারা বুঝতে পারছেন না বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দাবিদার মোদি সরকার হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এতটা একগ্রহে পড়লো কিভাবে। এই দৃশ্যটি কি আপনার খুব চেনা মনে হচ্ছে? একটু ফ্ল্যাশব্যাক করা যাক। মাত্র কয়েক মাস আগে। 2024 সালের জুলাই মাসে ঠিক এভাবেই আরেকটি দেশের স্বৈরাচারী সরকারের উপর আন্তর্জাতিক বিশ্বের খাড়া নেমে এসেছিল। সেদিন সেই দেশটির নাম ছিল বাংলাদেশ। আর আজ সেই দেশটির নাম ভারত। জুলাইয়ে শেখ হাসিনার উপর জাতিসংঘ যে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল আজ মোদির
ক্ষেত্রেও ঠিক একই ডোজ প্রয়োগ করা হলো। ভাবগতিক মোটেও ভালো নয়। গদি নাড়ানোর যে সাইক্লোন আজ দিল্লির দরজায় করানছে তা কি কেবল শুরু হলো? নরেন্দ্র মোদী। গত 10 বছর ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে নিজেকে বিশ্বগ্রহ হিসেবে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি ভেবেছিলেন পশ্চিমা বিশ্ব তার বিশাল বাজারের লোভে ভারতের অভ্যত্তরীণ মানবাধিকার লঙ্ঘন, ধর্মীয় উগ্রবাদ বা স্বৈরাচারী আচরণকে চিরকাল চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে। কিন্তু যখন কোন রাষ্ট্রের রাজপথে সাধারণ ছাত্রজনতা নাগরিক সমাজ আর সাংবাদিকদের উপর নগ্ন দমন পীরণ শুরু হয় তখন সেই মিথ্যার বেলুন ফুটো হতে এক মুহূর্তও সময় লাগে না। দিল্লির রাজপথে ককরোচ জনতা পার্টি বা তরুণদের
এই বাদভাঙ্গা আন্দোলনের উপর মোদির পুলিশ যখন গণহারে গ্রেপ্তার আর ক্র্যাকডাউন শুরু করল তখন পশ্চিমা বিশ্ব আর চুপ থাকলো না। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মুখপাত্র থামিনাল খিতান ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শীতল অথচ করা ভাষায় যে বিবৃতিটি দিলেন তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আক্ষরিক অর্থে একটি লাল কার্ড থামিনাল খিতান স্পষ্ট ভাষায় বললেন দিল্লিতে আজকের বড় বিক্ষোবের আগে এবং চলাকালে যেভাবে বিক্ষোবকারী আন্দোলনের নেতা নাগরিক সমাজের সদস্য আইনজীবী বা সাংবাদিকদের গণহারে আটক করা হয়েছে সেটা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি এখানেই থামেননি। তিনি মোদি সরকারকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার সুরে বলেন শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার পুরোপুরি সম্মান করতে হবে। কোন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোবে বিধিনিষেধ আরোপ করতে
হলে তার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে হবে। আর যাদের নির্বিচারে আটক করা হয়েছে তাদের অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিতে হবে। কঠিনদের ভাষায় এই বিবৃতি কোন সাধারণ উদ্বেগ নয়। এটি হলো একটি রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। এর মানে হলো বিশ্ব সম্প্রদায়িক মোদিকে আর গণতন্ত্রের রক্ষক বলে মনে করে না। পশ্চিমা বিশ্ব আজ বুঝতে পারছে যে মোদির এই স্বৈরাচারী রূপ ভারতের অভ্যন্তরীণ স্থীতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। আন্তর্জাতিকভাবে মোদি আজ ঠিক ততটাই একঘরে এবং বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। [মিউজিক] ইতিহাসের নির্মাম রসিকতাগুলো বড্ড অদ্ভুত। আজ মোদি সরকার জাতিসংঘের কাছ থেকে যে ডোজ বা সতর্ক বার্তা পাচ্ছে ঠিক কয়েক
মাস আগে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ঠিক একই ডোজ পেয়েছিলেন। জুলাই মাসে বাংলাদেশের ছাত্র জনতা যখন কোটা সংস্থারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল তখন শেখ হাসিনা পুলিশ র্যাব দুই ক্যাডার লিলিয়ে দিয়ে হাজার হাজার ছাত্রজনতা নাগরিক সমাজের সদস্য এবং সাংবাদিকদের গণহারে গ্রেপ্তার করেছিল। ইন্টারনেট বন্ধ করে পুরো দেশকে একটি বদ্ধভূমিতে পরিণত করেছিল। তখন জাতিসংঘ এমিনেস্ট ইন্টারন্যাশনাল থেকে শুরু করে পশ্চিমা বিশ্ব ঠিক আজকের মতোই করা বিবৃতি দিয়েছিল। তারা বলেছিল শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার দিতে হবে। অবিলম্বে আটকৃতদের মুক্তি দিতে হবে। শেখ হাসিনা সেই আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তার পেটুয়া বাহিনী দিয়ে তিনি চিরকাল ক্ষমতায় থাকবেন। কিন্তু ফলাফল কি হয়েছিল?
আন্তর্জাতিক সমর্থন হারানো সেই সরকার মাত্র 36 দিনের মাথায় তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছিল। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছেড়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টারের করে দেশ থেকে পালাতে হয়েছিল। আজ নরেন্দ্র মোদী ঠিক সেই একই ভুলের ফাদে পা দিয়েছেন। তিনি ভাবছেন তার পুলিশ আর ইডি দিয়ে তিনি দিল্লির রাজপথের বিক্ষোপ থামিয়ে দিবেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন যখন আন্তর্জাতিক বিশ্ব কোন স্বৈরাচারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন তার পতনের কফিনের সবচেয়ে বড় পেরিকটি ঠোকা হয়ে যায়। জুলাই শেখ হাসিনাকে যে ব্যাকরণে ক্ষমতাচুত করা হয়েছিল আজ মোদির ক্ষেত্রেও ঠিক সেই পতনের ব্যাকরণটি কাজ করতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের এই বিবৃতির পর সাউথ ব্লকের ভেতরে এখনো
রীতিমতো প্যানিক বা আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারণ মোদি সরকার খুব ভালো করে জানে এই বিবৃতি শুধু একটি কাগজের টুকরো নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞার প্রচ্ছন্ন হুমকি। রাষ্ট্রযতন্ত্র আজ কতটা নার্ভাস তা তাদের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। তারা শুধু রাজপথের আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করছে না। তারা নাগরিক সমতের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এমনকি সাংবাদিকদেরও গণহারে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। যখন কোন রাষ্ট্র তার নিজের দেশের আইনজীবী আর সাংবাদিকদের ভয় পেতে শুরু করে তখন বুঝতে হবে সেই রাষ্ট্র তার শেষ সীমানায় এসে পৌঁছেছে। পুলিশের এই গণগ্রেপতার কোন শক্তির মোহরা নয়। এটি হলো একটি ডুবন্ত জাহাজের যাত্রীদের খরখুটো
আঁকড়ে ধরে বাঁচার শেষ চেষ্টা। তারা ভেবেছে সবাইকে জেলে ভরে দিলে হয়তো কেউ আর মোদির বিরুদ্ধে কথা বলবে না। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না তারা যত বেশি মানুষকে জেলে ভরছে জেলের বাইরের মানুষের ক্ষোভ তত বেশি তীব্র হচ্ছে। এই গণগ্রেপ্তার মূলত ভারতের কোটি কোটি তরুণের মনে এই বার্তাটি স্থায়ী করে দিচ্ছে যে এই সরকার তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে না শুধু ক্ষমতা নিয়ে ভাবে। মানুষ কখন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। মানুষ রুখে দাঁড়ায়। ঠিক তখনই যখন তাদের ভেতর থেকে ভয় নামক অদৃশ্য দেয়ালটি হুরমুর করে ভেঙে পড়ে। স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র কখনোই তাদের পুলিশ, টিয়ার গ্যাস বা বন্দুকের বুলেট নয়। স্বৈরাচারের
সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সাধারণ মানুষের মনের ভেতরে গেঁথে দেয়া ভয়। আজ দিল্লির রাজপথে যে জেনজি প্রজন্ম নেমেছে তারা মোদির লাঠি চার্জ বা জলকামানকে ভয় পায় না। জাতিসংঘের এই বিবৃতি তাদের মনে আরো সাহস জুগিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে পুরো বিশ্ব আজ তাদের এই লড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা একা নয়। যে রাষ্ট্র তার নিজের তরুণদের ভয় পায় সে রাষ্ট্রই পুলিশ লেড়িয়ে দেয়। আজ দিল্লির রাজপথে যখন পুলিশ লাঠি চার্জ করছে তখন এই তরুণরা পালাচ্ছে না। তারা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে ব্যারিকেড ভাঙছে। তাদের চোখে মুখে কোন ভয় নেই। কারণ তারা জেনে গেছে স্বৈরাচারের আসল শক্তি তার বন্দুকে নয়
বরং জনতার ভয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকে। ঢাকা যেমন সেই ভয়ের মৃত্যু ঘটিয়েছিল আজ দিল্লিও ঠিক সেই ভয়হীন স্পর্ধার উদযাপন করছে। মোদির এই রিক্ট সিস্টেম বা জালিয়াতির সাম্রাজ্য হয়তো বাইরে থেকে খুব বেশি শক্তিশালী মনে হচ্ছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভারতের সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোবের বারুদ জমেছে তা জাতিসংঘার এই বিবৃতির পর আরো বেশি বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে। স্বৈরাচারীরা সবসময় ভাবে তারা পুলিশ আর বন্দুক দিয়ে যেকোনো রানওয়ে যেকোন রাজপথ নিজেদের কন্ট্রোলে রাখতে পারবে। কিন্তু তারা ভুলে যায় যখন জেনেভা থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন পর্যন্ত পুরো বিশ্ব পিঠ ঘুরিয়ে নেয়। তখন দেশের ভেতরের ওই রানওয়ে গুলোই স্বৈরাচারের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ
হয়ে দাঁড়ায়। জেনেভা থেকে আসা জাতিসংঘের ওই একটি বিবৃতি প্রমাণ করে দিয়েছে মোদি সরকারের পায়ের তলার মাটি আর অবশিষ্ট নেই। আন্তর্জাতিক সমর্থনহীন একটি সরকার ঠিক ততটাই দুর্বল যতটা ডাঙ্গায়িতলা একটি মাছ। আজ মোদি সরকার অহংকার করে যে রানওয়েতে দাঁড়িয়ে তরুণদের আটকে দিচ্ছে কাল হয়তো সেই রানওয়েতে তাদের নিজেদেরই কোন একটি বিশেষ বিমানে ওঠার জন্য ঊর্ধশ্বাসে দৌড়াতে হবে। ইতিহাসের বিচার এমনিই নির্মম। শেখ হাসিনাও ভেবেছিল পুরো বিশ্ব তার পকেটে। জুলাই মাসে জাতিসংঘ যখন তাকে সতর্ক করেছিল তিনি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন পতনের সাইক্লোন এসে আঘাত করল তখন তার সেই সাজানো প্রশাসন তাকে বাঁচায়নি। বরং তাকে মাত্র 45 মিনিটের নোটিসে একটি
সামরিক হেলিকপ্টারে তুলে দিয়ে দেশের সীমানা পার করে দিয়েছিল। আজ সাউথ ব্লকের অহংকারী ইমারতে যে ফাটল ধরেছে তা আর কোনভাবেই জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। কারণ এবার আক্রমণটা চতুর্মুখী। বাইরে থেকে ধেয়ে আসছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রচ্ছন্ন এক ঝড়। আর ভেতরে দিল্লির রাজপথে কাঁপাচ্ছে লাখো তরুণের ঢল। এই দ্বিমুখী সুনামির সামনে দাঁড়িয়ে সাউথ ব্লকের কর্তারা ক্রমশ অসহায় হয়ে পড়ছেন। দাবার বোর্ডের চেকমেট হয়ে গেছে। অহংকারী রাজা এখন চারদিক থেকে ঘেরাও। বিমানবন্দরের রানওয়ের সিগনাল লাইটগুলো জ্বলছে আর নিচ্ছে। ভিআইপি টার্মিনালের সামনে কি কোন একটি স্পেশাল ফ্লাইট খুব দ্রুতই প্রস্তুত করা হচ্ছে? পতনের এই শ্বাস শুদ্ধ করাকর ক্লাইমেক্সে কে আগে পালাবে? অলিগরকরা নাকি সৈরাচার
নিজে বিল্ড আপ শুরু হয়ে গেছে পতনের আজ কাল অথবা পরশু শেখ হাসিনার পরিণতি যেন ডাকছে নরেন্দ্র মোদিকে [মিউজিক]